গঙ্গাচড়ায় কোটি টাকার এইচবিবি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের বেতগাড়ী শাহপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে বানিয়াপাড়া পাকা রাস্তা মসজিদ পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কের বিভিন্ন অংশ দেবে যাওয়ায় প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ইট বসে গেছে এবং কোথাও কোথাও রাস্তা দেবে গেছে। কিছু অংশে পুনরায় সংস্কারকাজ চললেও কয়েকটি স্থানে শুধু ভিটি বালু দিয়ে বসে যাওয়া অংশ সমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে নির্ধারিত ৬ ইঞ্চি ভিটি বালুর পরিবর্তে মাত্র ৩ ইঞ্চি বালু ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া একাধিক ইটভাটার নিম্নমানের ইট দিয়ে নির্মাণকাজ করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আওতায় বাস্তবায়িত এইচবিবি-ডাব্লিউডি-৪১৩ প্যাকেজের অধীনে গঙ্গাচড়ার তিনটি স্থানে মোট ১ হাজার ৫০০ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ২৮ হাজার ৬১৩ টাকা। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ইটের ল্যাব টেস্টের প্রতিবেদন ছাড়াই কীভাবে নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় ভ্যানচালক গোলদার হোসেন বলেন, “আমি প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে ভ্যান চালিয়ে যাতায়াত করি। কাজ শেষ হওয়ার আগেই অনেক জায়গায় ইট বসে গেছে ও রাস্তা দেবে গেছে। ঠিকমতো বালু ব্যবহার করা হয়নি বলেই এমন হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। এখন ভ্যান নিয়ে চলাচল করলে গাড়ি দুলতে থাকে, যাতায়াতে খুব কষ্ট হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা মনিসুর রহমান বলেন, “এখানে নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। যেখানে ৬ ইঞ্চি বালু দেওয়ার কথা, সেখানে অনেক স্থানে ৩ ইঞ্চির মতো বালু দেওয়া হয়েছে। নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। তাই কাজ শেষ হওয়ার আগেই রাস্তা বসে গেছে। আমরা চাই, নিম্নমানের কাজ ভেঙে নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে ১ম শ্রেণীর ইট দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হোক।”
শাহপাড়া এলাকার শরিফুল ইসলাম কাল্টু বলেন, “কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়ক বসে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়,সড়কের দুই ধারে পর্যাপ্ত মাটি দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি, শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করেছি। আমরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চাই।”
উত্তর পানাপুকুর এলাকার জাহানুর রহমান বলেন, “কাজ চলাকালেই আমরা অনিয়মের প্রতিবাদ করেছিলাম। এখন রাস্তা বসে যাওয়ায় সেই অভিযোগের সত্যতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। আমরা চাই, প্রকল্পের নির্মাণমান যাচাই করে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
অভিযোগের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সজিবুল করিম নিম্নমানের ইট সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। ইটের ল্যাব টেস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইট পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট ছাড়াও কাজ করা যাবে।”
তবে এ বিষয়ে রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, “ইটের ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত রাস্তার কাজ করা উচিত নয়। অনিয়মের বিষয়টি জানতে পেরেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য আলোচনা করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, “রাস্তার কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অনিয়ম বা নিম্নমানের নির্মাণকাজের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, প্রকল্পটির কাজ গত ১০ জুন ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। এরই মধ্যে সড়কের বিভিন্ন অংশ বসে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্পটির কারিগরি মান যাচাই করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিম্নমানের অংশ পুনর্নির্মাণ করা হোক।






















