সবার চোখের সামনে কিডনি কেনাবেচার জমজমাট হাট!
‘ইমার্জেন্সি এ-পজিটিভ লাগবে, পাসপোর্ট থাকতে হবে’, ‘হিন্দু ও-নেগেটিভ লাগবে’— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন পোস্ট দেখে প্রথমে মনে হতে পারে জরুরি রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে এগুলো রক্ত নয়, বরং মানব অঙ্গ বা কিডনি কেনা-বেচার নিষিদ্ধ ও গোপন বিজ্ঞাপন।
আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে খোলাখুলিভাবে চলছে মানব অঙ্গের এই অবৈধ বাণিজ্য। দেশের দরিদ্র মানুষকে লক্ষ্য করে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্র অসহায় মানুষকে ফুসলিয়ে পাকিস্তানে পাঠিয়ে কোটি টাকার কিডনি ব্যবসা চালাচ্ছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো— এই অবৈধ বাণিজ্যে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের যোগসাজশ বা সহায়তার গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।
মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যদের বাইরে কারও সঙ্গে কিডনি বা অন্য কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনের এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ফেসবুকের বিভিন্ন ক্লোজড গ্রুপে প্রকাশ্যেই চলছে কিডনি বিক্রির অবৈধ ব্যবসা।
আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও ফেসবুকে অর্ধশতাধিক ক্লোজড গ্রুপে প্রকাশ্যেই চলছে কিডনির অবৈধ বাণিজ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে ‘ইমার্জেন্সি এ-পজিটিভ’ বা ‘ও-নেগেটিভ’ রক্তের প্রয়োজনের আড়ালে সাংকেতিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই অঙ্গ কেনাবেচা চলছে। দেশের অভাবী ও দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি, যেখানে কিছু আইনশৃঙ্খলা সদস্যের যোগসাজশ বা সহায়তার অভিযোগও উঠেছে
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুকে ‘কিডনি ডোনার গ্রুপ’, ‘কিডনি বিক্রি গ্রুপ’, ‘কিডনি ক্রয়-বিক্রয় গ্রুপ’, ‘কিডনি ডোনার ও প্রতিস্থাপন গ্রুপ’, ‘কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট’, ‘কিডনি ডোনার হেল্প সেন্টার’সহ অর্ধশতাধিক ক্লোজড গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের কয়েকটিতে সদস্য সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি ওপেন গ্রুপগুলোতেও প্রতিদিন শত শত বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই ঘটছে।
কিডনি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে একজন সুস্থ ব্যক্তির কিডনি পরিবারের বাইরে কাউকে দেওয়ার জন্য গ্রহীতাকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। তবে, রক্তের গ্রুপ যদি পজিটিভ হয় তবে এই দর প্রযোজ্য হয়। নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রে এই দাম এক কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
অথচ এই অবৈধ বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিডনিদাতা। তার ভাগ্যে জোটে মাত্র চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এর বিনিময়ে তাকে আজীবন পঙ্গুত্বের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচতে হয়। এই অসহায় মানুষগুলো অর্থের প্রলোভনে পড়ে নিজের মূল্যবান অঙ্গ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে অসাধু চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক কিডনি পাচার চক্রের ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড উঠে এসেছে। এই চক্রটি মূলত তিনটি সুসংগঠিত স্তরে কাজ করে, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত গোপনীয় এবং সুশৃঙ্খল করে তোলে।
প্রথম স্তরে সক্রিয় থাকে এলাকাভিত্তিক ও ফেসবুকভিত্তিক মাঠকর্মী। চক্রে তাদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এজেন্ট’। তাদের প্রধান কাজ হলো অভাবগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্ত মানুষকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো। তারা কিডনিদাতাকে পাকিস্তানে থাকা-খাওয়া, হাতখরচ এবং দেশে তার পরিবারের দেখভালের মতো রঙিন স্বপ্ন দেখায়। প্রতিটি কিডনি দাতার জন্য এই এজেন্টরা প্রায় তিন লাখ টাকা পায়। তবে, রক্তের গ্রুপ ‘নেগেটিভ’ হলে কমিশনের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশে এমন প্রায় ৫০০ এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে, যাদের অধিকাংশই জয়পুরহাটসহ উত্তরবঙ্গের মানুষকে টার্গেট করে। তারা যোগাযোগের জন্য শুধুমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে এবং তাদের ফোন নম্বর সবসময় বন্ধ থাকে।
কিডনি পাচার চক্রটি মূলত তিনটি সুসংগঠিত স্তরে কাজ করে— এজেন্ট, ফিক্সার্স ও রানার্স। প্রথম স্তরে ফেসবুক ও এলাকাভিত্তিক ‘এজেন্টরা’ দরিদ্র মানুষকে অর্থের প্রলোভনে রাজি করায়। দ্বিতীয় স্তরে ‘ফিক্সার্সরা’ পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট প্রসেসিং এবং করাচি পাঠানোর ব্যবস্থা করে। তৃতীয় স্তরে পাকিস্তানের ‘রানার্সরা’ বিমানবন্দর থেকে কিডনিদাতাদের রিসিভ করে আস্তানায় নিয়ে যায়। এই চক্রের মূল ‘কিংপিন’ কালোবাজারে কোটি টাকার কিডনি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে
কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চক্রের বিভিন্ন মামলার নথি ঘেটে দেখা যায়, দ্বিতীয় স্তরের সিন্ডিকেট মূলত দাতা ও গ্রহীতার পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট প্রসেসিংয়ের কাজ করে। চক্রে তাদের বলা হয় ‘ফিক্সার্স’। আগে ভারতের দিল্লি, ব্যাঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের ক্লিনিকে ট্রান্সপ্লান্ট হতো, কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির কারণে ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে চক্রটি এখন পাকিস্তানের করাচিকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সরাসরি ফ্লাইটে করাচি পাঠানোর ব্যবস্থা করে। ভুক্তভোগী যেন মাঝপথে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে না পারে, সেজন্য কিডনিদাতা, তার বাবা-মা এবং স্বামী-স্ত্রীর মূল এনআইডি কার্ড রেখে দেয়। তথ্য ফাঁস করলে বা অবাধ্য হলে কার্ড আটকে রেখে ব্ল্যাকমেইল করার হুমকি দেয়। এই স্তরের দালালরা প্রতিটি কিডনির জন্য পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
৫০টির বেশি কিডনি কেনাবেচা করেছেন আনিছুর
দাম ২০ লাখ, ভারতে নিয়ে শতাধিক মানুষের কিডনি বিক্রি
সিন্ডিকেটের তৃতীয় স্তরের সদস্যরা অবস্থান করে পাকিস্তানে। তাদেরকে বলা হয় ‘রানার্স’। তারা করাচি বিমানবন্দরে কিডনিদাতাদের রিসিভ করে সরাসরি নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যায়। এই স্তরের স্থানীয় এজেন্টরা জনপ্রতি এক লাখ টাকা পায়।
তবে, আন্তর্জাতিক কিডনি পাচার চক্রের সবচেয়ে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয় পাকিস্তানে অবস্থানরত চক্রের মূল হোতার হাতে, যাকে ‘কিংপিন’ বলে ডাকা হয়। ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে এই চক্রের ভয়াবহ কার্যপ্রণালী এবং নেপথ্যের কুশলী ব্যক্তিদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে খোলাখুলিভাবে চলছে মানব অঙ্গের এই অবৈধ বাণিজ্য
এই ‘কিংপিন’রা কালোবাজারে কিডনির ক্রেতা সংগ্রহ করে এবং কোন ব্ল্যাড গ্রুপের কতটি কিডনি প্রয়োজন, তা বাংলাদেশের নেটওয়ার্ককে জানিয়ে দেয়। এরপর বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধনাঢ্য রোগীদের করাচির ছোটখাটো ক্লিনিকে এনে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি কিডনি বিক্রির বিনিময়ে এই চক্র ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো— এই আন্তর্জাতিক কালোবাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ কিডনিই আসছে বাংলাদেশিদের শরীর থেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে সক্রিয় একাধিক কিংপিনের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন নুরুজ্জামান। গ্রেপ্তার হওয়া অনেক আসামিই জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম বলেছেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ এজেন্ট এই নুরুজ্জামানের সঙ্গেই হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ রাখে। কিন্তু চক্রের কেউই তাকে আজ পর্যন্ত সরাসরি দেখেনি।
তদন্তে অচলাবস্থা ও প্রশাসনিক সহযোগিতার অভিযোগ
এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, কিডনি বিক্রি চক্রগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে। কেউ এ ধরনের চক্রের খপ্পরে পড়লে অভিযোগ করার আহ্বান জানান তিনি, সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, এসব চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং পুলিশের সাইবার টিম সাইবার জগতে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো অপতৎপরতা নজরে এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এই অবৈধ বাণিজ্যে একটি কিডনির জন্য গ্রহীতাকে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হলেও, দাতার ভাগ্যে জোটে মাত্র চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও দরিদ্র কিডনিদাতারা আজীবন পঙ্গুত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে। অর্থের প্রলোভন, মাদকাসক্তি বা প্রতারণার শিকার হয়ে মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে, যা সামাজিক ও নৈতিক অগ্রগতির পরিপন্থী
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) একটি ইউনিট এই কিডনি পাচার চক্র নিয়ে কাজ করছে। তবে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ইউনিটের এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টের কাছে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের অপরাধের তদন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগোয় না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মূল হোতাদের নাম বলতে চায় না। আবার এজাহারে যাদের নাম থাকে, বাস্তবে তাদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তারাও মামলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
ওই কর্মকর্তার মতে, তাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী কিডনি চক্রের সদস্যরা এই পাচার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক সহযোগিতা পেয়ে থাকে, যা এই অবৈধ ব্যবসাকে আরও নিরুদ্বিগ্ন ও দীর্ঘস্থায়ী করছে।
সন্তানকে কিডনি দেবেন মা, সব কিছু প্রস্তুত, নেই শুধু টাকা
কিডনি বেচাকেনায় জড়িয়েছে ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতাল
মেয়েকে বাঁচাতে কিডনি বিক্রি করতে চান বাবা-মা
প্রশাসনিক যোগসাজশের ভয়াবহ চিত্র অনুসন্ধানে কিডনি পাচারে প্রশাসনিক যোগসাজশের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের ২৬ মার্চ এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
পাচারের উদ্দেশ্যে এক কিডনিদাতা যুবককে (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) পাকিস্তানে পাঠানোর জন্য বিমানবন্দরে নিয়ে আসে চক্রের এজেন্টরা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেক-ইন কাউন্টারে যুবকের নথিপত্র দেখে বোর্ডিং পাস ইস্যু করতে দ্বিধায় পড়েন কর্মকর্তারা। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে হাজির হন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই), নাম হালিম। গায়ে ইউনিফর্ম না থাকলেও বিমানের এক্সিকিউটিভকে নিজের আইডি কার্ড দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, ওই যুবক তার ভাই। এসআই হালিমের জোরাজুরিতে কর্মকর্তারা বোর্ডিং পাস ইস্যু করেন, তবে বিষয়টি তারা নোট করে রাখেন
ফেসবুকের গ্রুপগুলোতেও প্রতিদিন শত শত বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই ঘটছে
পরবর্তীতে গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ওই যুবক স্বীকার করেন, এসআই হালিম তার ভাই নন এবং তিনি তাকে আগে কখনোই দেখেননি। বোর্ডিং পাস নিশ্চিত করতেই মাদক কর্মকর্তা হালিম মিথ্যা পরিচয় দিয়ে পাচারকারীদের সহযোগিতা করেছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে। তারা ওই যুবককে পাকিস্তানে যেতে বাধা দেয় এবং বিমানবন্দর থেকে লিখন (ওরফে জুনায়েদ) নামে চক্রের এক এজেন্টকে গ্রেপ্তার করে।
এই ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই জাহিদ। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে এসআই জাহিদ ভিক্টিম কিডনিদাতাকেই অপরাধী চক্রের সদস্য ভেবে নানাভাবে হেনস্তা করেন এবং তদন্ত এগোতে চাননি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে অবশেষে তদন্ত শুরু হয়।
কিডনি পাচারের ঘটনায় প্রশাসনিক যোগসাজশের অভিযোগ তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন এসআই মিথ্যা পরিচয় দিয়ে পাচারকারীদের সহায়তা করার চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। দুর্বল তদন্ত, আসামিদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া এবং মূল হোতাদের আড়াল করার চেষ্টার কারণে অপরাধীরা প্রায়শই পার পেয়ে যাচ্ছে, যা এই অবৈধ ব্যবসাকে নিরুদ্বিগ্ন ও দীর্ঘস্থায়ী করছে
আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এসআই জাহিদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই জাহিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘মামলাটি এখনও তদন্তাধীন। রিমান্ডে আসামিরা মুখ খোলেনি, কোনো নাম পাওয়া যায়নি। তারা মূল হোতার নামও বলতে চায় না।’ অথচ ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রিমান্ডে আসামিরা এসআই জাহিদের কাছে স্বীকার করেছে যে, তাদের মূল হোতা নুরুজ্জামান। সে-ই কিডনি কেনাবেচার পুরো বিষয়টি সমন্বয় করে এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সার্বিক নির্দেশনা দেয়।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, মামলার এজাহারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এসআই হালিমের নাম স্পষ্ট উল্লেখ থাকার পরও পুলিশ তাকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। বোর্ডিং পাস সংগ্রহে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাচারকারীদের সহায়তাকারী এই কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। ঢাকা পোস্টের এই অনুসন্ধানে স্পষ্ট যে, কিডনি পাচার চক্রের শিকড় অনেক গভীরে এবং তাদের প্রশাসনিক সহায়তাকারীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে।
আন্তর্জাতিক কিডনি পাচার চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। করাচির ছোট ক্লিনিক থেকে শুরু করে ঢাকার নামী হাসপাতাল— কোথায়, কীভাবে এই অবৈধ বাণিজ্যের জাল ছড়ানো, তা উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিডনি পাচারকারীরা ডোনারদের (দাতা) যাবতীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা টেস্ট করানোর জন্য সাধারণত ঢাকার কয়েকটি নামী প্রতিষ্ঠানে পাঠায়। এর মধ্যে রয়েছে— সরকারি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু), ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এসব হাসপাতালের সঙ্গে কিডনি পাচার বা অবৈধ প্রতিস্থাপনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক বা যোগসাজশ পাওয়া যায়নি। তারা কেবল দাতার শারীরিক উপযুক্ততা যাচাইয়ের জন্য এসব কেন্দ্র ব্যবহার করে,
কিডনি পাচারকারীরা ডোনারদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ঢাকার কয়েকটি নামী প্রতিষ্ঠানে পাঠায়। তবে এসব হাসপাতালের সঙ্গে কিডনি পাচার বা অবৈধ প্রতিস্থাপনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি,
তবে, গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের একাধিক সদস্যের জবানবন্দিতে ভয়াবহ তথ্য মিলেছে। বাংলাদেশে আইনত পিতা-মাতা, সন্তান বা নিকটাত্মীয় (রক্তের সম্পর্ক) ছাড়া অন্য কারও কিডনি প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু চক্রের সদস্যরা জানিয়েছে, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অপরিচিত ডোনারকে রোগীর আত্মীয় সাজিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপনের নজির রয়েছে। একজন আসামি স্বীকার করেছে, নকল নথিপত্র ব্যবহার করে সাধারণ ডোনারকে রোগীর আত্মীয় হিসেবে দেখিয়ে এই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়েছে।
কিডনি বিক্রি করতে যাওয়ার পথে পুলিশ রক্ষা করলেন দুই ভুক্তভোগীকে
মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ভারতে নিয়ে কিডনি বিক্রির চেষ্টা
অবশ্য অবৈধভাবে কিডনি প্রতিস্থাপনের এই প্রক্রিয়ায় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কোনো চিকিৎসকের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি হাসপাতালের প্রশাসনিক বা নথিপত্র যাচাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এই জালিয়াতি করেছে।
এই সংকট উত্তরণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকাগুলোতে, যেখানে এই চক্রের প্রভাব বেশি, সেখানে কিডনি হারানোর শারীরিক কুফল ও আইনি জটিলতা সম্পর্কে প্রচার বাড়ানো প্রয়োজন। অভাব বা প্রতারণার শিকার হয়ে যাতে কোনো মানুষকে অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে না হয়, সেজন্য সরকারকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক
গ্রেপ্তার হওয়া আসামি ও সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের শরীর থেকে নেওয়া কিডনি মূলত পাকিস্তানের করাচির কয়েকটি নির্দিষ্ট হাসপাতালে প্রতিস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— ডা. জিয়াউদ্দিন হাসপাতাল, নিউ হরাইজন কেয়ার হাসপাতাল, আদিল হাসপাতাল, পাকিস্তান লাহোর বেহরিয়া ইন্টারন্যাশনাল হসপিটাল এবং ইসলামাবাদ ফারুক ইনকিলাব হসপিটালসহ কয়েকটি ছোট ক্লিনিক। পাচারকারী চক্রের সদস্যরা এসব হাসপাতালের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তারা হাসপাতাল থেকে ভুয়া ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (NOC) বা অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করে। দাতা ও গ্রহীতাকে ভুয়া আত্মীয় সাজিয়ে আইনি জটিলতা এড়াতে তারা লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডির কিছু ছোট ক্লিনিককেও ট্রানজিট বা সাময়িক আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে বলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা স্বীকার করেছে।পুলিশের খাতায় ক্রেতারা ‘অদৃশ্য’, দুর্বল তদন্তে পার পাচ্ছে অপরাধীরা
২০২৪ সালের মে মাসে নেত্রকোনার রবিন নামে এক যুবককে জোরপূর্বক ভারতে নিয়ে গিয়ে কিডনি দিতে বাধ্য করে একটি চক্র। এই ঘটনায় রবিন ঢাকার ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন। এজাহারে তিনি কয়েকজন আসামির নাম এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বর্ণনা দেন। কিন্তু পুলিশ এই মামলার তদন্তে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেনি। অবশেষে আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে (ফাইনাল রিপোর্ট) পুলিশ জানায়, আসামিদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এই অজুহাতে কিছু আসামিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চিহ্নিত আসামিরা ভারতে অবস্থান করছেন, ফলে চক্রের মূল অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
২০২২ সালে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তাদের মধ্যে রাসেল নামে একজন কিডনি পাচারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ভাটারা থানায় এই ঘটনায় মামলা করা হয় এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তবে, এই মামলার তদন্তের পরিণতিও একই রকম। মামলার অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) পুলিশ মূল অভিযুক্ত রাসেলকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করে। কারণ হিসেবে পুলিশ জানায়, তদন্তে রাসেলের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কিডনি পাচারকারীরা ডোনারদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিভিন্নভাবে আশ্বস্ত করে। ঢাকা পোস্টের হাতে থাকা এমন একটি স্ক্রিনশট
শুধু তাই নয়, এই মামলার চার্জশিটে চক্রটি কবে থেকে সক্রিয় এবং কতজনের কাছ থেকে কিডনি সংগ্রহ করেছে— সেই বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। কিডনিগুলো কাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে, সেই সুনির্দিষ্ট তথ্যও প্রতিবেদনে ছিল না। পুলিশের এমন দায়সারা এবং দুর্বল তদন্তের কারণেই পাচারকারীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির একটি থানার এসআই, যিনি কিডনি সংক্রান্ত মামলার তদন্ত করেছেন, জানান যে এই চক্র ধরা অত্যন্ত কঠিন। তার মতে, কিডনি পাচার চক্রটি ‘স্লিপার সেল’-এর মতো কাজ করে। তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে এবং আলাদা আলাদা স্তরে সক্রিয়। এক স্তরের সদস্য অন্য স্তরের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখে না। যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশি কোনো মোবাইল সিম ব্যবহার করে না। তারা ভারতীয় বা পাকিস্তানি নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে যোগাযোগ চালায়। প্রয়োজনে তারা কিডনি দাতার সঙ্গে যোগাযোগ করে, কিন্তু দাতা পরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাদের আর পাওয়া যায় না।
কিডনি পাচার চক্রের বিষয়ে র্যাবের সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতেও নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই-বাছাই করে সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়
র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, চক্রের কেউ গ্রেপ্তার হলে পুরো নেটওয়ার্ক একটি স্লিপারের মতো নীরব হয়ে যায়। এরপর তারা আবার নতুনভাবে সক্রিয় হয়। যোগাযোগের এই জটিলতা এবং চক্রের সুসংগঠিত কাঠামোর কারণেই অধিকাংশ সময় তদন্তে আগানো সম্ভব হয় না বলে তিনি দাবি করেন।
অনুসন্ধানে কিডনি বিক্রির দরকষাকষি, অনুসন্ধানে কিডনি কেনাবেচার দালাল চক্রের ভয়াবহ ও সুসংগঠিত তৎপরতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ফেসবুকের কঠোর অ্যালগরিদম ফাঁকি দিতে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে চক্রটি নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিডনি বিক্রির দালালরা এখন ফেসবুকের নজরদারি এড়াতে সরাসরি ‘কিডনি’ শব্দ ব্যবহার করছে না। পরিবর্তে তারা ‘কে’ বা ‘ও পজিটিভ/ও নেগেটিভ’ (রক্তের গ্রুপ)- এর মতো নির্দিষ্ট কোড ওয়ার্ড বা সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এছাড়া, নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল বা কভার ছবিতে ধর্মীয় বাণী অথবা স্বনামধন্য হাসপাতালের লোগো ব্যবহার করে তারা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা চালায়।
চক্রটির কার্যপ্রণালী গভীর থেকে জানতে একজন প্রতিবেদক ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তিনি নিজেকে কিডনি দানে আগ্রহী হিসেবে উপস্থাপন করে ফেসবুকের একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যোগাযোগের কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রতিবেদককে +৯২ নম্বরের (পাকিস্তানের কান্ট্রি কোড) একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে কল দেওয়া হয়।
শুরুতে দালাল চক্রের সদস্য প্রতিবেদককে আশ্বস্ত করতে আন্তরিকভাবে কথা বললেও, দ্রুতই সে মূল প্রসঙ্গে চলে আসে। কথোপকথনে এজেন্ট জানায়, একটি কিডনির বিনিময়ে চার লাখ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। তবে, পাসপোর্ট না থাকলে দালালের মাধ্যমে তা করিয়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা কেটে রেখে চূড়ান্তভাবে চার লাখ টাকা দেওয়া হবে।
তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কিডনি প্রতিস্থাপনের অপারেশনটি হবে পাকিস্তানের করাচিতে। বাংলাদেশ থেকে সেখানে যাওয়া, থাকা এবং খাওয়ার যাবতীয় খরচ সিন্ডিকেট বহন করবে। এমনকি, করাচিতে অপারেশনের আগেই ঢাকায় অবস্থানরত ভুক্তভোগীর পরিবারের হাতে টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তাও দেয় ওই এজেন্ট।
কিডনি প্রতিস্থাপন চক্রের ‘মূলহোতা’ বাংলাদেশি : দিল্লি পুলিশ
চক্রের ফাঁদে পড়লেই খোয়াতে হয় কিডনি
চাকরির লোভে ভারতে গিয়ে কিডনি হারালেন ৩ বাংলাদেশি
টাকা এবং করাচিতে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে প্রতিবেদক যখন একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন, তখনই সতর্ক হয়ে যায় ওই দালাল। প্রতিবেদকের ধারাবাহিক এবং খুঁটিনাটি প্রশ্নে সে সম্ভবত তাকে সন্দেহ করতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই দালালের সুর বদলে যায়। সে নতুন অজুহাত দিয়ে দাবি করে, ‘ডাক্তাররা অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তির কিডনি নিতে চায় না, তাই আপনারটা নেওয়া সম্ভব নয়।’ এই কথা বলেই সে তড়িঘড়ি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরবর্তীতে ওই নম্বরে প্রতিবেদক একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও দালাল আর ফোন ধরেনি।
টার্গেটে নিম্নবিত্ত ও ঋণগ্রস্তরা: পাচারের আগমুহূর্তে বেঁচে ফিরলেন আরিফুল
অর্থনৈতিক অনটন ও ঋণের বোঝা কীভাবে মানুষকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়, তার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে গোয়ালন্দের ২৪ বছর বয়সী আরিফুল ইসলামের অভিজ্ঞতায়। চলতি বছরের মার্চে ঋণের চাপ থেকে মুক্তি পেতে মাত্র পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে নিজের একটি কিডনি বিক্রি করতে রাজি হয়েছিলেন তিনি। পাচারকারী চক্রের খপ্পর থেকে শেষ মুহূর্তে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা আরিফুল ঢাকা পোস্টের কাছে তুলে ধরেছেন সেই রোমহর্ষক বর্ণনা।
আরিফুল জানান, কিডনি বিক্রির প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর এক এজেন্ট তাকে রাজবাড়ী থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। ঢাকার ‘নোয়াখালী হোটেলে’ তার নামে আগে থেকেই রুম বুক করা ছিল এবং যাবতীয় খরচ পরিশোধ করা ছিল। হোটেলে রেখেই চক্রটি অত্যন্ত গোপনে তার টিস্যু টেস্ট, এক্স-রে, আল্ট্রা-সনোগ্রাম, ইউরিন ও ইকোসহ প্রয়োজনীয় সব মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করে। দুই দিন পর তাকে জানানো হয়, কিডনি প্রতিস্থাপনের অপারেশনটি পাকিস্তানে হবে এবং সেই অনুযায়ী পাকিস্তান অ্যাম্বাসি থেকে তার ভিসাও করিয়ে নেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের উচিত দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ দায়ের করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত সব প্রমাণ যেমন যোগাযোগের তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করা। বিদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান
এই পুরো প্রক্রিয়ায় এজেন্টের সঙ্গে আরিফুলের যোগাযোগ ছিল সম্পূর্ণ একতরফা। শুধুমাত্র হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেই সব কথা হতো, সরাসরি ফোন কলে তাদের কখনোই পাওয়া যেত না। এমনকি আরিফুলের মেডিকেল রিপোর্টগুলোও চক্রটি নিজেদের জিম্মায় রেখে দেয়, যা তাকে মানসিকভাবে আরও অসহায় করে তোলে।
ভিসা হওয়ার পর আরিফুলকে নিয়ে যাওয়া হয় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে ইমিগ্রেশনের অপেক্ষায় থাকার সময় আরিফুল হঠাৎ এজেন্টের একটি গোপন কথোপকথন শুনে ফেলেন। আরিফুল বলেন, ‘আমি জানতে পারি, কিডনি নেওয়ার পর আমাকে আর দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না, বরং বিদেশে পাচার করে দেওয়া হবে। এই কথা শুনেই আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি এবং বুঝতে পারি আমি কত বড় বিপদে পা দিয়েছি।’
সেই মুহূর্তেই সাহসিকতার পরিচয় দেন আরিফুল। তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের শরণাপন্ন হন এবং পুরো বিষয়টি খুলে বলেন। পুলিশের সহায়তায় তিনি পাচার প্রক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা পান এবং শেষ পর্যন্ত নিরাপদে বাসায় ফিরে যান।
বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মত
আরিফুলের মতো প্রতিদিন শত শত যুবক-যুবতী প্রলোভনের শিকার হয়ে কিডনি দিতে বাধ্য হচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, ‘মূলত আর্থিক অনটন, মাদকাসক্তির ব্যয় মেটানো এবং অপরাধী চক্রের প্রতারণা— এই তিনটি কারণেই মানুষ কিডনি বিক্রির মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছে। যখন কোনো রোগী আইনি প্রক্রিয়ায় নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে অঙ্গ পেতে ব্যর্থ হন, তখনই অবৈধ চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং অভাবী মানুষকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অঙ্গ কেনাবেচায় প্ররোচিত করে, যা সামাজিক ও নৈতিক অগ্রগতির অন্তরায়।’
তিনি আরও বলেন, এই সংকট উত্তরণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকাগুলোতে, যেখানে এই চক্রের প্রভাব বেশি, সেখানে কিডনি হারানোর শারীরিক কুফল ও আইনি জটিলতা সম্পর্কে প্রচার বাড়ানো প্রয়োজন। অভাব বা প্রতারণার শিকার হয়ে যাতে কোনো মানুষকে অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে না হয়, সেজন্য সরকারকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ বিষয়ে র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, কিডনি পাচার চক্রের বিষয়ে র্যাবের সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতেও নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই-বাছাই করে সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অভাবের তাড়নায় কিডনি বিক্রি করেছেন একই এলাকার ৬ জন
তিন শতাধিক কিডনি চুরি-পাচার, চিকিৎসক গ্রেপ্তার পাকিস্তানে
চাকরির প্রলোভনে ভারতে নিয়ে কিডনি বিক্রি, ক্রেতাও বাংলাদেশি
অঙ্গ বাণিজ্য ও বিদেশে পাচার: দুই আইনেই কঠোর শাস্তি
‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী, মানবদেহের যেকোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিশেষ করে কিডনি ও যকৃত ক্রয়-বিক্রয় বা এর বিনিময়ে কোনো প্রকার আর্থিক বা অন্য সুবিধা গ্রহণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। আইন অনুযায়ী, বৈধভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন কেবল নিকটাত্মীয়দের (যেমন: বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী এবং নির্দিষ্ট কিছু রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়) মধ্যেই করা সম্ভব। দাতা ও গ্রহীতার প্রকৃত সম্পর্ক যাচাইয়ে এখন ডিএনএ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে ব্যয় হয় প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। বেসরকারি পর্যায়ে তা ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্রক্রিয়াটি শেষ করতে এক থেকে তিন মাস সময় লাগে।
অন্যদিকে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দালাল চক্রের মূল লক্ষ্য থাকে দরিদ্র মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করা। এই পুরো প্রক্রিয়া ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। দাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে সীমান্ত পার করে করাচিতে অপারেশন পর্যন্ত— সবকিছুই মানবপাচারের আওতায় পড়ে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর ধারা ১৮ মূলত অঙ্গ কেনা-বেচা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এই ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে কিডনি বা অন্য অঙ্গ ক্রয় বা বিক্রয় করতে পারবেন না। একই সঙ্গে এ ধরনের লেনদেনের জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া, প্রলোভন দেখানো বা দালালি করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে, নিকট আত্মীয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও নিঃস্বার্থভাবে অঙ্গ দান বৈধ, যেখানে কোনো আর্থিক লেনদেন বা চাপ প্রয়োগ থাকবে না।
ধারা ১৯ এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের শাস্তি নির্ধারণ করে। এ ধারার আওতায় অঙ্গ কেনা-বেচা, প্রলোভন, প্রতারণা বা জোরপূর্বক সম্মতি আদায়ের মতো অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে সীমান্ত পার করে করাচি বা অন্য কোথাও অপারেশন করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি মানবপাচারের আওতায় পড়ে। এই আইনে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ভুক্তভোগীদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের উচিত দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ দায়ের করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত সব প্রমাণ যেমন যোগাযোগের তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করা। বিদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।













