স্বামী-স্ত্রীর শ্রমেও নুন আনতে পান্তা ফুরায়
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে দুই ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন বরিশাল থেকে আসা আব্দুল গণি। প্রায় সাত বছর আগে ঢাকায় এসে শুরুতে মুদি দোকান দিয়ে সংসার চললেও বড় ঋণের ভারে তাকে দোকান ছাড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে গত বছর গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজ বেছে নিতে হয়েছে তাকে। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের অন্যান্য ব্যয় বহন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে স্ত্রীকেও একই কাজে যুক্ত করতে হয়েছে। দুজনের আয় দিয়েও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এই দম্পতি।
মুদি দোকান হারিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মিরপুরের আব্দুল গণি ও তার স্ত্রী গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। স্বামী-স্ত্রী মিলে মাসে সর্বোচ্চ ২৭ হাজার টাকা আয় করলেও বাসা ভাড়া, ঋণের কিস্তি এবং দুই ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। প্রতি মাসের শেষে তাদের ধার করে চলতে হচ্ছে
আব্দুল গণি জানান, স্বামী-স্ত্রী মিলে তারা মাসে সর্বোচ্চ ২৭ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। স্ত্রী অসুস্থ হওয়ায় ওভারটাইম করতে পারেন না। বেতনের থেকে নয় হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিতে হয়। ঋণের কিস্তি দিতে হয় আরও পাঁচ হাজার টাকা। বড় ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। ওদের দুজনের পড়াশোনায় আরও অন্তত পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। এরপর বাকি সাত-আট হাজার টাকা দিয়ে সংসারের যাবতীয় ব্যয় মেটাতে হয়। প্রায় প্রতি মাসেই শেষের দিকে ধার করে চলতে হয়। অনেক মাসে অসুস্থতার জন্য স্ত্রী কাজে যেতে না পারলে আরও কমে যায় আয়। তখন বেশি ঝামেলায় পড়তে হয়।
২০২৩ সালে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। শ্রমিক নেতারা বলছেন, একজনের আয়ে চারজনের পরিবার চলা বিশ্বব্যাপী নিয়ম হলেও বাংলাদেশে দুজনের আয়েও সংসার চলছে না। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, বহির্বিশ্বে একজন শ্রমিকের আয়ে ন্যূনতম চার সদস্যের পরিবার পরিচালিত হওয়ার মতো বেতন কাঠামো নির্ধারিত থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে একজনের আয় দিয়ে দুজনের ব্যয় বহন করাও কষ্টসাধ্য। পরিবারের কর্তা যিনি, তার বেতনের অর্থ দিয়ে বাড়তি একজনের জীবিকা নির্বাহ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে চতুর্থ গ্রেডের একজন পোশাক শ্রমিকের আয় দিয়ে রাজধানী ঢাকায় স্বামী-স্ত্রী দুজনের জীবিকা নির্বাহ সম্ভব হচ্ছে না। এতে বাধ্য হয়ে স্বামীর সঙ্গে অর্থ উপার্জনে শ্রম দিতে হচ্ছে স্ত্রীকেও।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়। তাতে ন্যূনতম মজুরি (চতুর্থ গ্রেড) দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অবশ্য অনেক কারখানায় এখনও ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে শ্রমিক নেতাদের।
বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের বেতন কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে যেখানে একজনের আয় দিয়ে ন্যূনতম চারজন সদস্যের পরিবার পরিচালনা সম্ভব হয়। অথচ আমাদের দেশে একজন শ্রমিকের আয় দিয়ে দুজনের পরিবার পরিচালনাই অসম্ভব। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে আগামীতে বৈশ্বিক কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে যেন শ্রমিকদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়
আমিরুল হক আমিন, সভাপতি, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন (এনজিডব্লিউএফ)
বিজ্ঞাপন
ন্যূনতম বেতন কাঠামোর হার অনুযায়ী, একজন পোশাক শ্রমিক ওভারটাইমসহ মাসে সর্বোচ্চ আয় করতে পারেন ১৬-১৭ হাজার টাকা। এই হিসাবে ওভারটাইম করে দুজনের আয় হয় ৩২ থেকে ৩৪ হাজার টাকা। অথচ বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় চার সদস্যের একটি পরিবার পরিচালনায় ন্যূনতম ব্যয় হয় ২৮ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এটি অবশ্য গত বছরের আগস্ট মাসের জরিপ। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবারের পরিচালন ব্যয় গত কয়েক মাসের ব্যবধানে আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (এনজিডব্লিউএফ) সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, তিন বছর আগে শ্রমিকদের যে বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে সেটি দিয়ে এখন কোনো শ্রমিকের পক্ষেই জীবনের ন্যূনতম চাহিদাগুলো মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে দ্রব্যমূল্য যে হারে বেড়েছে, এতে তাদের ঢাকায় টিকে থাকার ন্যূনতম ক্ষমতাও দিন দিন কমছে। যখন ২০২৩ সালে ওই বেতন কাঠামোটি চূড়ান্ত হয়, তখনই আমরা এটিকে খুবই ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে প্রতিবাদ করেছিলাম। আমরা ন্যূনতম ১৮ হাজার টাকা ধার্য করতে প্রস্তাব দিয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের বেতন কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে যেখানে একজনের আয় দিয়ে ন্যূনতম চারজন সদস্যের পরিবার পরিচালনা সম্ভব হয়। অথচ আমাদের দেশে একজন শ্রমিকের আয় দিয়ে দুজনের পরিবার পরিচালনাই অসম্ভব। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে আগামীতে বৈশ্বিক কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে যেন শ্রমিকদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
সম্প্রতি জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএনএসকাপ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩২ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের আয় ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম। আর ৭ শতাংশ শ্রমিকের আয় আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে। এমনকি দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৯২ শতাংশ শ্রমিকের চাকরির কোনো লিখিত চুক্তিও নেই।
সংস্থাটির তথ্যমতে, রপ্তানি চাহিদা কমে গেলে অনানুষ্ঠানিক এবং সাব-কন্ট্রাক্টে ঠিকা কাজে থাকা পোশাক শ্রমিকরা অত্যন্ত ঝুঁকিতে পড়বেন। এ ধরনের কাজে কোনো নোটিশ পিরিয়ড বা চাকরির নিরাপত্তা থাকে না। এ কারণে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। সাধারণত যে কোনো পরিস্থিতিতে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের শ্রমিকরাই প্রথম শিকার হয়ে থাকেন। এছাড়া, পুনরায় নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার থাকে না। দীর্ঘমেয়াদি এবং ক্রমাগত রপ্তানি চাহিদা কমতে থাকলে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মূল্যায়ন আরও কমতে পারে বলে ধারণা সংস্থাটির।
আমরা সম্মিলিতভাবে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিতে চাই। এজন্য বিভিন্ন সংগঠনের থেকে লিখিত আকারে প্রস্তাবগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে। এগুলো একত্রিত করে খুব শিগগিরই সরকারকে আমরা জানাব
আমিরুল হক আমিন, সভাপতি, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন (এনজিডব্লিউএফ)
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সর্বশেষ প্রাক্কলন প্রতিবেদনে বলা হয়, এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদন খাতের দুই কোটি ৭০ লাখের বেশি চাকরি বা মোট উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থানের নয় শতাংশ সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত চাহিদার সঙ্গে যুক্ত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের পোশাক শিল্প-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলো সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নানা প্রতিবন্ধকতা ও অভিঘাতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্য প্রবেশ ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। এতে বাংলাদেশসহ ওই দেশগুলোর শ্রমিকদের চাকরির ওপর ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাটি।
এদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নেওয়া তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিয়মিত পাঁচ শতাংশের সঙ্গে অতিরিক্ত চার শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বা বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অনেক কারখানায় মানা হচ্ছে না বলে দাবি শ্রমিক নেতাদের। চলতি বছরেও বড় তৈরি পোশাক কারখানাগুলো শ্রমিকদের নয় শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি করলেও অনেক ছোট-মাঝারি ও ঠিকায় কাজ করা (সাবকন্ট্রাক্টিং) কারখানাগুলো এই মজুরি বৃদ্ধি করেনি। যারা বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেননি তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন শ্রমিক নেতারা। অবশ্য শিগগিরই পোশাক শ্রমিকদের বেতন কাঠামো বাড়িয়ে পুনর্নির্ধারণ করতে সরকারের কাছে সম্মিলিতভাবে প্রস্তাব জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।
এ বিষয়ে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, বর্তমান শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর শ্রমিকদের বেতন পুনর্নির্ধারণ হওয়ার কথা। সর্বশেষ ২০২৩ সালে পোশাক শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণ হওয়ার পর এটি তিন বছর হতে চলছে। এবার আমরা শ্রমিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেব। আলাদা আলাদা প্রস্তাব না দিয়ে একসঙ্গে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো এরই মধ্যে আলোচনাও শুরু করেছে। বর্তমান ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে খুব শিগগিরই সরকারের কাছে সম্মিলিতভাবে প্রস্তাব পেশ করা হবে।
শ্রমিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিনও। তিনি বলেন, আমরা সম্মিলিতভাবে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিতে চাই। এজন্য বিভিন্ন সংগঠনের থেকে লিখিত আকারে প্রস্তাবগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে। এগুলো একত্রিত করে খুব শিগগিরই সরকারকে আমরা জানাব।













