ত্রিশালে ২ কোটি ২৬ লাখ টাকায় নির্মিত সড়কে নিম্নমানের কার্পেটিংয়ের অভিযোগ
ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি গ্রামীণ সড়কের কার্পেটিং নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সদ্য কার্পেটিং করা সড়কে হাত দিয়ে ঘষা দিলেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ। কোথাও কোথাও পা দিয়ে চাপ দিলেও আলগা হয়ে উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং। কাজ শেষ হওয়ার মাত্র এক দিনের মধ্যেই এমন পরিস্থিতি দেখা দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বৃষ্টির মধ্যেই কার্পেটিংয়ের কাজ চালানো হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের বেড প্রস্তুত, ইটখোয়া বালু পাথরের স্তর এবং বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের মান যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এ কারণে কার্পেটিং সড়কের সঙ্গে ঠিকমতো সংযুক্ত হয়নি বলে তাদের দাবি।
সরেজমিনে দেখা গেল, হাত দিলেই উঠে আসছে পিচ
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের ধলা খানবাড়ী তিন রাস্তার মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সদ্য কার্পেটিং করা সড়কের বিভিন্ন অংশে হাত দিয়ে ঘষা দিলে পিচ ও কার্পেটিংয়ের স্তর উঠে আসছে। কিছু জায়গায় পা দিয়ে চাপ দিলেও স্তর আলগা হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, কাজ চলার সময় বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই কার্পেটিংয়ের কাজ চালিয়ে যাওয়া হয় বলে তাদের অভিযোগ। নতুন সড়কের এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রোকন আল ইবনে মাহাদী ঘটনাস্থলে গিয়ে সড়কটি পরিদর্শন করেন।
২ হাজার ৩৯৮ মিটার সড়ক, কার্পেটিং হয়েছে প্রায় এক কিলোমিটার
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পের আওতায় সড়কটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ধলা খানবাড়ী তিন রাস্তার মোড় থেকে নির্মাণাধীন সড়কটির দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৩৯৮ মিটার। এর মধ্যে সম্প্রতি প্রায় এক হাজার মিটার অংশের কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বাপ্পি এন্টারপ্রাইজ।
প্রকল্পটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তীতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সড়কটির নির্মাণ/সংস্কারকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
প্রকৌশলীদের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
সড়কের কাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ছিল কি না এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, সড়কের প্রতিটি ধাপে নির্মাণসামগ্রীর মান, বেডের প্রস্তুতি, স্তরের পুরুত্ব, উপকরণের অনুপাত এবং কার্পেটিংয়ের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এসব বিষয় যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত প্রকৌশলগত তদারকি থাকলে নির্মাণের সময়ই ত্রুটি শনাক্ত করে তা সংশোধন করা সম্ভব হতো। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরপরই কার্পেটিং উঠে যাওয়ায় পুরো সড়কের নির্মাণমান নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইটখোয়া বালু পাথর ঠিকমতো দেওয়া হয়নি
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাটি লেভেল করার পর প্রয়োজনীয় ইটখোয়া, বালু ও পাথরের স্তর যথাযথভাবে প্রস্তুত না করেই কার্পেটিং করা হয়েছে। ফলে কার্পেটিংয়ের সঙ্গে নিচের স্তরের প্রয়োজনীয় বন্ধন তৈরি হয়নি। এ কারণেই সামান্য চাপেই পিচ উঠে আসছে বলে তাদের ধারণা।
তারা আরও জানান, বিভিন্ন স্থানে ছোট যানবাহন চলাচল করতেই সড়কের ওপর চাপ পড়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে ভারী যানবাহন চলাচল শুরু হলে সড়কটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
স্থানীয় বাসিন্দা আতাহারুল ইসলাম বলেন, পা দিয়ে চাপ দিলেই কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। নতুন সড়কে কোনোভাবেই এমন হওয়ার কথা নয়। নির্মাণকাজের সময় আমরা প্রতিবাদ করলেও কোনো কাজে আসেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. এখলাস আলী বলেন, সড়কে প্রয়োজনীয় উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি বলেই কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। এখনই যদি এমন অবস্থা হয়, ট্রাক চলাচল শুরু হলে সড়কে কিছুই থাকবে না।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি সড়ক যদি নির্মাণের পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় সংস্কারের প্রয়োজন হতে পারে। এতে একদিকে জনগণের দুর্ভোগ বাড়বে, অন্যদিকে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কাও তৈরি হবে।
ঠিকাদারের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেসার্স বাপ্পি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. মাজহারুল ইসলাম এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কাজ করা হয়েছে। কার্পেটিং উঠে গেলে আমার কী করার আছে। কিছু বুঝার বাকি থাকলে ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা
ত্রিশাল উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. যুবায়েত হোসেন বলেন, সড়কের অনিয়মের বিষয়টি আমি ইতোমধ্যে অবগত আছি। সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শুধু কার্পেটিং তুলে নতুন করে দিলেই কি সমাধান?
এখন মূল প্রশ্ন উঠেছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে নির্মাণকাজ চলাকালে মান নিয়ন্ত্রণ ও মাঠপর্যায়ের তদারকি কতটা কার্যকর ছিল? নির্মাণের এক দিনের মধ্যেই যদি কার্পেটিং উঠে যায়, তাহলে সড়কের অন্যান্য অংশের কাজের মান যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
এলাকাবাসী সড়কটির পুরো অংশের কারিগরি পরীক্ষা, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই, কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব পরীক্ষা এবং প্রকল্পের নকশা ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, শুধু উঠে যাওয়া কার্পেটিং পুনরায় বিছিয়ে দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কেন কার্পেটিং উঠে গেল, কাজের সময় যথাযথ তদারকি ছিল কি না এবং সরকারি অর্থের বিনিময়ে প্রকল্পের নির্ধারিত মান নিশ্চিত করা হয়েছে কি না তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
~ এম.এ.এইচ রাকিবুল ইসলাম
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি


























