পেনশনের ৫০ লাখ টাকায় শিশুদের জন্য ‘প্রকৃতির পাঠশালা’ গড়লেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক
চাকরি থেকে অবসরে গেছেন পাঁচ বছর আগে। তবে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো আর তাদের শেখানোর আগ্রহ থেকে একদিনের জন্যও অবসর নেননি নওগাঁর সাপাহার উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শামসুর রহমান। নিজের পেনশনের টাকা, ধান ও আম বিক্রির অর্থ মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এক বিনোদন ও শিক্ষাকেন্দ্র। নাম দিয়েছেন ‘প্রকৃতির পাঠশালা’।
উপজেলার তিলনা ইউনিয়নের ধন্টিপাড়ায় নিজের ৯০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা এই পাঠশালা এখন স্থানীয় শিশুদের কাছে আনন্দের এক অনন্য ঠিকানা। ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করা এ পাঠশালায় প্রতিদিন বিকেল হলেই ভিড় জমায় আশপাশের বিভিন্ন এলাকার শিশুরা। কেউ দোলনায় চড়ে, কেউ খেলাধুলায় মেতে ওঠে, আবার কেউ ফুল, ফল ও বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু শেখে।
শিশুদের বিনোদনের জন্য এখানে রয়েছে স্লিপার, দোলনাসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা। পাশাপাশি রয়েছে ফুল ও ফলের বাগান, পুকুরঘাট, বসার জায়গা এবং পুরোনো কৃষি উপকরণের সংগ্রহ। প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের নির্মল আনন্দ দেওয়াই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট বা অর্থ দিতে হয় না।
শামসুর রহমান চাঁচাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা জীবনে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখতেন তিনি। বিদ্যালয়ের ফুলের বাগান পরিচর্যা থেকে শুরু করে নানা ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের প্রকৃতিপ্রেমী করে তোলার চেষ্টা করতেন। ২০২১ সালে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরও শিশুদের নিয়ে তাঁর সেই ভাবনা থেমে থাকেনি। বরং অবসরজীবনের সময়টুকু শিশুদের জন্য কাজে লাগানোর চিন্তা থেকেই নিজের বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলেন ‘প্রকৃতির পাঠশালা’।
এই পাঠশালার প্রতিটি কাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন শামসুর রহমান নিজেই। প্রতিদিন সকালে পুরো জায়গা পরিষ্কার করা, গাছপালায় পানি দেওয়া এবং বাগানের পরিচর্যাসহ সবকিছু দেখভাল করেন তিনি। দিনের বড় একটি সময় কাটে শিশুদের সঙ্গে। শুধু নিজের পাঠশালায় নয়, বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়েও শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন কলম, খাতা ও টিফিন ক্যারিয়ারের মতো প্রয়োজনীয় উপহার। শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করাই তাঁর এসব উদ্যোগের লক্ষ্য।
শামসুর রহমানের এই উদ্যোগে উপকৃত হচ্ছে শিশুদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকেরাও। বিকেলে সন্তানদের নিয়ে অনেক মা-বাবা এখানে আসেন। সবুজ পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর পাশাপাশি শিশুদের খেলাধুলা ও আনন্দ উপভোগ করেন তাঁরা। ঈদ ও পূজার মতো উৎসবের সময় দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য স্থানটি ব্যবহার করেছে।
বর্তমান সময়ে শিশুদের বড় একটি অংশ যখন মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, তখন শামসুর রহমানের এই উদ্যোগ তাদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসার একটি ইতিবাচক প্রচেষ্টা। এখানে শিশুরা খেলাধুলার পাশাপাশি গাছপালা, ফুল-ফল, প্রাণী ও গ্রামীণ ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছে।
ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ কিংবা সঞ্চয়ের পেছনে অবসরজীবন ব্যয় না করে শিশুদের আনন্দ ও বিকাশে নিজের উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করেছেন এই শিক্ষক। তাঁর প্রায় ৫০ লাখ টাকার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ প্রমাণ করে, মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা থাকলে অবসর কখনোই থেমে থাকার নাম নয়।
শামসুর রহমানের ‘প্রকৃতির পাঠশালা’ তাই শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়; এটি শিশুদের আনন্দ, শিক্ষা, প্রকৃতিপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার এক অনুকরণীয় উদ্যোগ। তাঁর এই ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সমাজের অন্যদের জন্যও হতে পারে অনুপ্রেরণার উৎস।

























