বগুড়ার মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ, সোনালি ধানের স্বপ্নে কৃষক
দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ। বাতাসে দুলছে আমন ধানের গাছ। কোথাও কোমরসমান ধানগাছ, কোথাও আবার কাইচ থোড়ের অপেক্ষায় বিস্তীর্ণ জমি। মাঠের পর মাঠ ছড়িয়ে থাকা সবুজ আমন ধানের অপরূপ দৃশ্য যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা ছবি।
সেই সবুজের মাঝে ভালো ফলনের স্বপ্ন বুনে দিন-রাত জমির পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বগুড়ার কৃষকরা।
চলতি আমন মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকার আমন ধানের ক্ষেত এখন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সবুজে ছেয়ে গেছে সদরসহ শাজাহানপুর, শেরপুর, ধুনট, গাবতলী, সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, শিবগঞ্জ, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, নন্দীগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠ। কোথাও আগাম জাতের ধান ইতোমধ্যে শীষ ধরেছে, আবার কোথাও ধানগাছ দ্রুত বেড়ে উঠে পরিণত হচ্ছে কাইচ থোড়ে।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ থেকে ৬ লাখ ৬১ হাজার ৮৩৮ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। জেলায় এবার হাইব্রিড এবং উচ্চ ফলনশীল উফশী জাতের ধান চাষ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আমন ধানের চারা রোপণের সময় কিছুটা বিলম্ব হলেও পরবর্তী সময়ে জমিতে পর্যাপ্ত পানি ও দফায় দফায় মাঝারি বৃষ্টিপাত হওয়ায় ধানের চারা দ্রুত বেড়ে উঠেছে।
বর্তমানে অধিকাংশ জমিতে ধানের গাছ সতেজ ও সবুজ রয়েছে।
জানা যায়, বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে আমনের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে এবার অনেক বীজতলায় চারা তুলনামূলক ধীরগতিতে বেড়ে ওঠায় কিছু এলাকায় জমিতে চারা রোপণ কিছুটা পিছিয়ে যায়। পরে জমিতে প্রয়োজনীয় পানি ও অনুকূল আবহাওয়া পাওয়ায় সেই ঘাটতি অনেকটাই পুষিয়ে উঠেছে। সবুজ ধানের ক্ষেত এখন কৃষকের কাছে শুধু ফসলের জমি নয়, বরং পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আশার জায়গা।
ভালো ফলনের আশায় নিয়মিত জমিতে গিয়ে ধানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন তারা। আগাছা পরিষ্কার, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক প্রয়োগসহ নানা ধরনের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের। চারা রোপণের প্রায় তিন সপ্তাহ পর থেকে জমিতে আগাছা পরিষ্কার, প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হয়। ধীরে ধীরে ধানগাছ বেড়ে ওঠার পর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে কাইচ থোড় আসে। এরপর কাইচ থোড় থেকে বের হয় ধানের শীষ। শীষে ধান পূর্ণতা পেয়ে মাথা নুইয়ে সোনালি রং ধারণ করলেই শুরু হবে কাঙ্ক্ষিত ধান কাটার মৌসুম।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় আগাম জাতের আমন ধান চাষ হওয়ায় কিছু কৃষক হেমন্তের মাঝামাঝি সময় থেকেই ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর সাধারণ জাতের আমন ধানও আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে কাটার উপযোগী হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন কৃষকেরা।
কাহালু উপজেলার মুরইল ইউনিয়নের শীতলাই গ্রামের কৃষক মো. আব্দুল গোফফার মন্ডল বলেন, বোরো ধান চাষে জমিতে পানি সেচ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় অনেক বেশি। কিন্তু আমন ধানে সেই তুলনায় খরচ কম।
তিনি বলেন, তিনি এ বছর ৯ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। আমন ধান নিয়ে এবার তার আশা অনেক। জমিতে ধানগাছ ভালো হয়েছে। এখন আবহাওয়া ভালো থাকলে এবং ধানের ন্যায্যদাম পাওয়া গেলে কৃষক লাভবান হবেন। কৃষকদের টিকিয়ে রাখতে সার, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা দরকার। একই সঙ্গে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যদাম নিশ্চিত করাও জরুরি।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান, আমন ধানের উৎপাদন বাড়াতে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উঠান বৈঠক, মাঠ পরিদর্শন এবং কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে ধান চাষের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় আমন ধানের ক্ষেতের অবস্থা ভালো। অনুকূল আবহাওয়া, প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত ও জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতার কারণে ধানের চারা দ্রুত বেড়ে উঠছে। ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আমনে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে সবুজে ছেয়ে থাকা বগুড়ার মাঠ এখন কৃষকের নতুন স্বপ্নের ঠিকানা। প্রতিটি ধানের শীষে যেন লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের প্রত্যাশা। অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাই থেকে ফসলের সুরক্ষা এবং উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য এই তিন প্রত্যাশা পূরণ হলে সবুজ আমন ক্ষেত কয়েক মাস পর কৃষকের ঘরে বয়ে আনবে কাঙ্ক্ষিত সোনালি ফসল।


























