১৪ লাখ রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ কী
‘সামনের ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে গিয়ে উদ্যাপন করবেন’-এমন স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে পাশে বসিয়ে এমন আশার বার্তা দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদও শেষ হয়েছে, কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষা শেষ হয়নি রোহিঙ্গাদের।
গেল বছর রমজানে (১৪ মার্চ) রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার করতে গিয়ে এ কথা বলেছিলেন ড. ইউনূস। এরপর রোহিঙ্গারা আশায় বুক বাঁধলেও শুরু হয়নি একজন রোহিঙ্গারও প্রত্যাবাসন। উল্টো প্রায় প্রতিদিন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা, নোবেলজয়ী পরিচিতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা সব মিলিয়ে তাঁর এমন অঙ্গীকারে উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে তৈরি হয়েছিল নতুন প্রত্যাশা।
এরপর সময় গড়িয়েছে। ড. ইউনূস সরকারের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। সামনে ঈদও এসে গেছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা বন্দি রয়ে গেছে ঠিক কাঁটাতারের শরণার্থী শিবিরে। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আট বছরেও প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেনি। তবে স্বাভাবিকভাবেই তাদের সংখ্যা বেড়েছে; যা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে প্রায় ১২ লাখ হলেও বেসরকারি হিসাবে ১৪ লাখের কাছাকাছি। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও চলমান সংঘাত এখনো কোনো স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোয়নি। এ কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জটিলতা রয়ে গেছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলায় যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা বর্তমান সরকারও বজায় রাখবে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাবিষয়ক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আগে শুরু করা প্রক্রিয়াগুলো অব্যাহত রাখবেন বলেই বিশ্বাস করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সীমিত সময়ের মধ্যেও রোহিঙ্গাসংকট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃশ্যমান করেছে দাবি করে মিজানুর রহমান বলেন, ‘জাতিসংঘে একটি স্পেশাল কনফারেন্স হয়েছে। বাংলাদেশে তিন দিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের নজরে বিষয়টি আনা হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এসেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আবার এ নিয়ে সম্পৃক্ততা শুরু হয়েছে এটা বড় বিষয়। রোহিঙ্গাসংকট আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। ইস্যুটা আবার আলোচনায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।’ ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ রোহিঙ্গা। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আশ্রয়শিবির গড়ে উঠেছে কক্সবাজারে।
বাংলাদেশ বহুবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিলেও নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিশ্চয়তা না থাকায় তা সফল হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারে বিদায়ের পর ইউনূস সরকার স্বপ্ন দেখালেও শুরু করতে পারেনি কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাবাসন। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মাঝে। তারা আশা করছে শিগগিরই নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে স্বদেশে ফিরতে পারবে।
ক্যাম্প-১৮-এর বাসিন্দা আবদুল হাই বলেন, ‘১৯৯১-৯২ সালে বিএনপি সরকার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করিয়েছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারও অতীতের মতো উদ্যোগ নিয়ে তাদের নিরাপত্তার সঙ্গে স্বদেশে ফেরত পাঠাবে বলে আশা করছি।’
উখিয়ার ক্যাম্প-১৬-এর বাসিন্দা করিম আলী বলেন, ‘ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় আমরা নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে অনেক আশাবাদী ছিলাম। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসায় আমরা নতুন করে আশা করছি, একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে বসবাসরত আবদুস সালাম বলেন, ‘ড. ইউনূসের আশ্বাসে আমরা সত্যিই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল এবার হয়তো সত্যি ফিরব। কিন্তু সেই আশা পূরণ হলো না।’
‘ইউনাইটেড কাউন্সিল ফর রোহিঙ্গা’র প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। প্রতিনিধিত্বমূলক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।’
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক দাঙ্গা, সংঘাত ও সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এখন অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাখাইনের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। সেখানে কোনো বৈধ, কার্যকর সরকার নেই। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন বাস্তবসম্মতভাবে অনিশ্চিত।’ রোহিঙ্গাসংশ্লিষ্টদের মতে বাস্তবতা এখন আরও জটিল। নতুন সরকারের সামনে রোহিঙ্গাসংকট আগের মতোই এক কঠিন বাস্তবতা। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া কঠিন করে তুলেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য, জাতীয় নীতিমালা আর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। আর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক। ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে আনুমানিক দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।




















