বিলেতের আইন ডিগ্রি ছেড়ে সফল খামারি
রাহাতুল খান রাহাত ভারতের দার্জিলিং থেকে ‘ও’ লেভেল, ঢাকার স্কলাস্টিকায় ‘এ’ লেভেল শেষ করে ব্রিটিশ স্কুল-অব-ল থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক করেন। এরপর যুক্তরাজ্যের নর্থামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিষয়েও আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন বগুড়ার সন্তান রাহাতুল খান।
শিক্ষাজীবনের এই তালিকা শুনলে অনেকের মনে হতে পারে, তরুণটি হয়তো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে চাকরি করছেন কিংবা দেশের অভিজাত কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বিদেশি ডিগ্রিধারী এই তরুণ বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা। করেছেন গবাদি পশুর খামার।
খামারি রাহাতুল খানের স্ত্রী রুমাইয়া তাসনিম ব্যারিস্টার। তবে রাহাতুল খান নিজেকে একজন কৃষক ও খামারি হিসেবে পরিচয় দিতেই পছন্দ করেন। যে সমাজে এখনো কৃষি কাজকে নিচু পেশা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া, বিদেশি ডিগ্রিধারী এক তরুণের খামার করার গল্প সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে।
রাহাতের বাড়ি বগুড়া সদর উপজেলার ধাওয়াকোলা গ্রামে। চণ্ডীহারায় প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে তাঁর আর কে অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড। মাত্র ৯টি গরু দিয়ে শুরু। এখন তাঁর খামারে ১০৫টি গরু। এর মধ্যে রয়েছে শাহিওয়াল, অনগোল, ব্রাহামা, সিন্দি, ফ্রিজিয়ান, গির ও ভুট্টি জাতের গরু। কিছু গরুর দাম তিন লাখ টাকা, কিছু গরুর মূল্য ১০ লাখ টাকার বেশি। শুধু গরুই নয়, তাঁর খামারে ছাগল-ভেড়াও রয়েছে। বীজ ও বাচ্চা উৎপাদনের কাজও হচ্ছে।
রাহাত বলেন, কেন খামারে নামলাম, এর উত্তর আসলে কঠিন। শখ থেকেই শুরু। ধীরে ধীরে আজকের জায়গায় এসেছি। তবে এই পথ সহজ ছিল না। পরিবারের সবাই শুরুতে বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। অনেকের প্রশ্ন ছিল, এত পড়াশোনা করে খামারে কেন? প্রথমে কেউই খুব একটা পছন্দ করেনি। ধীরে ধীরে সফলতা আসার পর সমর্থন পেয়েছি।
খামারে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে রাহাত বলেন, সমাজে এখনও কৃষিকে সম্মানের পেশা হিসেবে দেখা হয় না। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশের কাছে কৃষি মানেই শেষ বিকল্প। এই দেশে চাকরিকে নিরাপদ জীবন মনে করা হয়। ব্যবসায় ঝুঁকি আছে বলে অনেকে ভয় পান। কিন্তু কোনো কাজ যদি মন থেকে করা যায়, তাহলে সফল হওয়া সম্ভব।
বিদেশি ডিগ্রি কৃষি কাজে কতটা কাজে লেগেছে এমন প্রশ্নে রাহাতের উত্তর, অবশ্যই কাজে লেগেছে। বিশেষ করে ব্যবসা পরিচালনা, পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনায়। লন্ডনের ব্যবসায়িক পরিবেশ আর বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়, তবে সেখানে যা শিখেছেন, তা সফলতার সিঁড়ি হয়েছে।
ব্যারিস্টার রুমাইয়া তাসনিমও এখন তার বড় অনুপ্রেরণা। শুরুতে সমাজের কিছু মন্তব্য শুনতে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো কমে গেছে। রাহাত বলেন, আগে শ্বশুরবাড়ির অনেকে ভিন্নভাবে দেখতেন। এখন আর কেউ কিছু বলেন না।
রাহাতের খামার ঘুরে দেখা গেছে শ্রমিকদের ব্যস্ততা। শ্রমিক সাইফুল ইসলাম জানান, পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন তিনি। প্রতিদিন সকালে এসে খামার পরিষ্কার করেন। এরপর গরুগুলোকে খাবার দেন। দুপুরে আবার এসে গরুর জন্য ঘাস প্রস্তুত করেন। প্রতিদিন দুপুর ১২টার দিকে গরুগুলোকে গোসল করানো হয়। বিকেল ৫টার দিকে আবার খাবার দেওয়া হয়।
ম্যানেজার আব্দুল বারী ১১ বছর ধরে রাহাতের খামারে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, খামারেই তাঁর বসবাস। কারণ ২৪ ঘণ্টাই গরুগুলোর দেখভাল করতে হয়। কোন গরুকে কিভাবে খাবার দিতে হবে, কোনটার কী সমস্যা সবকিছু তদারকি করতে হয়। এখানে এক লাখ থেকে ৮ লাখ, ১০ লাখ, ২২ লাখ, এমনকি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের গরুও আছে।
আব্দুল বারী বলেন, কিছু গরু সরাসরি খামার থেকে বিক্রি হয়। আবার কিছু মহাজনের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। অনেক সময় মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই গরু বিক্রির চুক্তি হয়ে যায়। পরে ক্রেতার কাছে গরু পৌঁছে দেওয়া হয়। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চাপ বেড়েছে। রোববারও ১৩ লাখ টাকার দুটি গরু বিক্রি হয়েছে।
খামারি রাহাতের অভিমত, দেশের অনেক শিক্ষিত তরুণ এখনও শুধু চাকরির পেছনেই ছোটেন। কারণ সমাজে চাকরিকে ‘নিরাপদ’ ও ‘সম্মানজনক’ পেশা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু কৃষি ও উদ্যোক্তা খাতে যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা অনেকেই বুঝতে চান না। সামাজিকভাবে অনেকে এখনও এসব পেশাকে ছোট মনে করেন। এ কারণেই শিক্ষিত তরুণরা কৃষিতে আসেন না। কিন্তু সংকোচ ভেঙে সম্ভাবনাময় খাতে এগিয়ে আসা উচিত।

























