গোপালগঞ্জে ভোটার হয়রানির তদন্ত হিমাগারে, ১৪ দিনেও মেলেনি রিপোর্ট
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে ওঠা চরম ভোটার হয়রানি, অবমাননা ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত এক প্রকার হিমাগারে চলে গেছে। গত ২৩ জুন জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য ও প্রমাণাদিসহ তদন্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হলেও দীর্ঘ ১৪ দিন পার হয়ে গেছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি, নেওয়া হয়নি কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা।এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পূর্বেই অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছেন যেন তারা অলিখিতভাবে ‘দোষমুক্ত’ হয়ে গেছেন। এমনকি ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরোক্ষ হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। ফলে এই তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সংবাদ প্রকাশের পর ইসি’র তদন্ত কমিটিঃ এর আগে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসের চরম হয়রানি ও জনদুর্ভোগের চিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসার পর বিষয়টি আমলে নেয় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন সচিবালয়ের স্মারক নং-১৭.১১.০০০০.০০০.৫১.০০৮.২৩-২৯৭ এবং নিকস, ঢাকা-এর পত্রের প্রেক্ষিতে ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মাদ রবিউল আলমকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
গত ২৩ জুন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অলিউর রহমানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত শুনানিতে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভুক্তভোগীরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ও মৌখিক জবানবন্দি দেন। শুনানিতে উঠে আসে সাধারণ মানুষকে হেনস্তার কিছু চাঞ্চল্যকর চিত্র:
• দিনমজুরকে পোশাক নিয়ে কটূক্তি: নতুন ভোটার হতে যাওয়া সবুজ বালা নামের এক দরিদ্র দিনমজুরকে নির্বাচন কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার বসু জিজ্ঞেস করেন, তার পরনের জামা-প্যান্টের দাম কত? দিনমজুর সবুজ বালা জামা-প্যান্ট মিলিয়ে ১৫০০ টাকা দাম বললে, কর্মকর্তা কটূক্তি করে বলেন, “এত দামি জিনিস কীভাবে কিনলে? তোমার ভোট হবে না।” এই বলে তাকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
• স্বামীর ঠিকানায় ভোট দিতে বাধা: রিপা আক্তার নামের এক গৃহবধূ তার স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা (উলপুর, গোপালগঞ্জ সদর) অনুযায়ী ভোটার হওয়ার আবেদন করলে নির্বাচন কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, স্বামীর ঠিকানায় ভোট হবে না, বাবার ঠিকানায় যেতে হবে। রিপা আক্তারের শ্বশুর এসে অনুরোধ করলেও তাকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
• ৪ মাস ঘোরানোর পর আবেদন বাতিল: মোসাম্মাৎ শাবানা আক্তার নামের এক নারী তার অনলাইন জন্ম নিবন্ধনসহ সব বৈধ কাগজপত্র জমা দিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পন্ন করেন। এরপর দুই মাস ঘোরানোর পর তাকে বলা হয় তদন্ত হবে এবং পরবর্তীতে ১০৫ নম্বর থেকে এসএমএস দিয়ে তার আবেদনটি বাতিল করা হয়। ৪ মাস ধরে তিনি অফিসে অফিসে ঘুরছেন।
• দিনের পর দিন হয়রানি: আনুকুল চন্দ্র ঘোষ এবং উর্মিলা মিত্র নামের দুই ব্যক্তি প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র নিয়ে মাসের পর মাস ঘুরলেও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার অবহেলা ও অনীহার কারণে ভোটার হতে পারেননি।
• ভোটার ফিঙ্গার ডিলিট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন আলহাজ শেখ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৫৯৩৯৫), মাহিম শেখ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৫৯৩৯৩), আবু মুসা শেখ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৫৯৩৯৬), মো. নাইম শেখ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৫৯৩৯৪) এবং মো. আনিচ শরীফ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৩০৭৭০)।
• গোপন সুত্রে জানা যায় নির্বাচন অফিসার অনিমেষ কুমার বসু তীর্থ মন্ডল নামের এক ভোটারের ২ টি নিবন্ধন ফরম পুর্ন করে ১ম টা (NIDFN120385844 ) ,০২-০৪-২০২৬ তারিখে ফরম পুরন করে ভোটার হয়নি জন্ম নিবেন্ধন নম্বারঃ২০০৭৩৫১৫৮৬১১২৭২২৩, কিন্তু এবং ২য় টা ফরম (NIDFN120395871) দিয়ে ভোটার হয়েছেন। তবে প্রথমে তাকে বলা হয়েছে ভোট হবে না পরে কিভাবে ভোট হলো বিষয় টা নিয়ে অনেকের অভিযোগ উঠেছে।
অফিসে চলে ‘মনগড়া’ আইন, মুছে ফেলা হয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট! ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন ও ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা, নারীদের সাথে রুক্ষ ব্যবহার এবং ব্যক্তিভেদে মনগড়া বিধি-বিধান প্রয়োগ করা নিত্যদিনের ঘটনা। সামান্য কথাতেই সাধারণ মানুষকে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এমনকি অনেক আবেদনকারীর ডাটাবেজ থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে ফেলা হয়েছে বলেও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগে কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে ভোটার হয়রানি এবং জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের “রোহিঙ্গা” বলে মন্তব্য করার অভিযোগে তদন্ত হয়েছিল। যা ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর জাতীয় দৈনিক ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সচিত্র প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ, তিনি একজন অভ্যাসগত অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যঃ ১৪ দিন পার হলেও কেন প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি—এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মাদ রবিউল আলম জানান, তিনি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেননি এবং বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন’ রয়েছে।
তবে এই ‘তদন্তাধীন’ শব্দের আড়ালে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষ, স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীরা। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী অভিযুক্তদের বরখাস্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের-এর সিনিয়র সচিবসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।























