বগুড়ায় অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় টানা অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় শুধু কৃষকের ফসলই তলিয়ে যায়নি, ভেঙে গেছে তাদের কষ্টার্জিত স্বপ্নও। শীত কিংবা গ্রীষ্মের প্রখর রোদ উপেক্ষা করে কৃষক অনুর্বর জমিতে সোনা ফলান। সেই ফসল বিক্রির টাকায় সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা ও সারা বছরের অন্নসংস্থানের স্বপ্ন দেখেন তারা। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঝড় ও অতিবৃষ্টি মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বগুড়ার কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এরই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্থানীয় কাঁচাবাজারেও।
জেলায় চলতি মৌসুমে ৬ হাজার ৭৫১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হলেও অতিবৃষ্টিতে ৪১৭ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পাট, মরিচ এবং গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি।
কৃষকদের আশঙ্কা, জমি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা না গেলে তাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন সবজির সংকটও দেখা দিতে পারে।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৩৩ হাজার ২৫৩ হেক্টর জমিতে আউশ, আমনের বীজতলা, পাট, মরিচ, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে আউশ, ৯ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে পাট, ৬ হাজার ৭৫১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি, ৪ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে আমনের বীজতলা, ৫৯২ হেক্টর জমিতে মরিচ এবং ৬৬০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা রয়েছে।
অতিবৃষ্টিতে ৪১৭ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সারিয়াকান্দি উপজেলায়। সেখানে ৩ হাজার ২০০ কৃষকের ১৬৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া শাজাহানপুরে ৯১ কৃষকের ১৪ হেক্টর, সোনাতলায় ৩২৪ কৃষকের ৩৮ হেক্টর, দুপচাঁচিয়ায় ৪৭০ কৃষকের ৬০ হেক্টর, কাহালুতে ৪৯১ কৃষকের ৭৫ হেক্টর এবং আদমদীঘিতে ৩৮৫ কৃষকের ৪৫ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে ৩১ হেক্টর আউশ, ১১৫ হেক্টর পাট, ৯৬ হেক্টর বিভিন্ন ধরনের সবজি, ১২৩ হেক্টর আমনের বীজতলা, ২২ হেক্টর মরিচ এবং অন্যান্য ফসলের ১৩ হেক্টর জমি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আমনের বীজতলা চাষি—এ সংখ্যা ২ হাজার ৪২ জন। তবে বগুড়া সদর, গাবতলী, শিবগঞ্জ ও নন্দীগ্রাম উপজেলায় কোনো কৃষিজমি নিমজ্জিত হয়নি।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি প্রাথমিক হিসাব। বন্যার পানি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে বগুড়া আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, চলতি জুলাই মাসের শুরু থেকেই জেলাজুড়ে দফায় দফায় ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গত বছরের জুলাই মাসে জেলায় মোট বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৩৯৫ দশমিক ৩ মিলিমিটার। এবার অতিবৃষ্টিতে জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ৭টি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে বহু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজিত চন্দ্র জানান, জেলায় ৩৩ হাজার ২৫৩ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৪১৭ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৯৬১ জন কৃষক। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। জলাবদ্ধতা কয়েক দিন স্থায়ী হলে এসব জমির ফসল আর রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
সারিয়াকান্দি উপজেলার কৃষক এনামুল হক বলেন, পটল চাষে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করেছি। কিছু বিক্রি করতে পেরেছি। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে এখন পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো পুঁজি নেই। বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি।
বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। জরুরি বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। পাশাপাশি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে দ্রুত বীজ, সার ও আর্থিক প্রণোদনা পান, তা নিশ্চিত করা হবে।
























