লামায় পাহাড় কাটা বন্ধে হাইকোর্টের ৩ দিনের নির্দেশ
লামায় পাহাড় কাটা বন্ধে হাইকোর্টের ৩ দিনের নির্দেশ
ইটভাটার মাটির জোগানে পাহাড় ধ্বংসের অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে মনিটরিং টিম।
বান্দরবানের লামা উপজেলায় অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধে তিন দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি মনিটরিং টিম গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী এ কাজে স্থানীয় আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডারকে কার্যকর সহযোগিতা করতেও বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঁইয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রিটের শুনানি শেষে এসব নির্দেশ দেন।
আদালতে রিটকারী পক্ষের আইনজীবীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লামা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটার মাটির জোগান দিতে পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘৪০ ইটভাটার জন্য পাহাড় ধ্বংস’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
অভিযানের পরও প্রশ্ন
পাহাড় কাটার অভিযোগে লামায় এর আগেও প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ফাইতং ইউনিয়নে পাহাড় কাটা ও অবৈধভাবে ইট পোড়ানোর অভিযোগে তিনটি ইটভাটার মালিককে মোট ৬ লাখ টাকা জরিমানা করে উপজেলা প্রশাসন।
এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে লামার ফাইতং ইউনিয়নসহ কয়েকটি এলাকায় একাধিক ইটভাটার বিরুদ্ধে অনুমোদন ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ না মানার অভিযোগ উঠে আসে। একটি প্রতিবেদনে ফাইতং ইউনিয়নে ১৭টি ইটভাটাকে অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এসব তথ্যের বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—অভিযান ও জরিমানার পরও যদি পাহাড় কাটার অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে এর পেছনে কারা এবং কীভাবে জড়িত, তা কার্যকরভাবে শনাক্ত করা হচ্ছে কি না।
শুধু পাহাড় কাটা নয়, মাটির উৎসও তদন্তের দাবি
লামায় ইটভাটার সংখ্যা, মাটির চাহিদা এবং পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইটভাটার জন্য পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহের অভিযোগ এসেছে।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড় কাটার ঘটনা বন্ধ করতে শুধু ঘটনাস্থলে অভিযান চালালেই হবে না। কোন পাহাড় থেকে মাটি কাটা হচ্ছে, কার জমি থেকে কাটা হচ্ছে, মাটি কোথায় যাচ্ছে, কোন ইটভাটায় তা ব্যবহার হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ইটভাটার প্রয়োজনীয় অনুমোদন আছে কি না—এসব বিষয় সমন্বিতভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
পরিবেশ আইনে শাস্তির বিধান
রিটের শুনানিতে রিটকারীর পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পাহাড় কাটা বা ধ্বংসের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। আইনটির ১৫ ধারায় এ ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তি ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
হাইকোর্ট পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে অগ্রগতি আদালতে জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের আদেশের ফলে এখন প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের পাশাপাশি মনিটরিং ব্যবস্থার কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেটে ফেলা পাহাড়ের কী হবে?
হাইকোর্টের রুলে লামায় পাহাড় কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, বান্দরবান জেলার পাহাড় কাটা ও ধ্বংস বন্ধে কেন প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং ইতোমধ্যে কেটে ফেলা পাহাড় পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
ফলে মামলাটি এখন শুধু পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড় ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় এসেছে।
নজর এখন প্রশাসনের ওপর
হাইকোর্টের তিন দিনের সময়সীমার পর লামায় বাস্তবে কী ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়, কতটি পাহাড় কাটার স্থান শনাক্ত করা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়—তা এখন দেখার বিষয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, মাটি পরিবহনের ব্যবস্থা এবং মাটি ব্যবহারকারী ইটভাটার পুরো চক্রকে তদন্তের আওতায় এনে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






















