পথ হারিয়ে ছাতকে আসা শারমিনের বিয়ে হলো সেই শিশু পরিবারের আঙিনায়
একদিন পথ হারিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চড়ে সুনামগঞ্জের ছাতকে চলে এসেছিল ছোট্ট শারমিন আক্তার। চেনা ছিল না কোনো ঠিকানা, জানা ছিল না কোথায় তাঁর আপনজন। সেই অনিশ্চয়তার দিনগুলোতে আশ্রয় হয় সরকারি শিশু পরিবার। সেখানে স্নেহ, মমতা ও নিরাপত্তায় কেটে যায় জীবনের প্রায় ১২ বছর।
সময় গড়িয়েছে। সেই ছোট্ট শারমিন এখন ১৯ বছরের তরুণী। এবার নিজের পছন্দের মানুষকে জীবনসঙ্গী করে শুরু করেছেন নতুন জীবন। আর তাঁর বিয়ের আয়োজনও হয়েছে সেই সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারের আঙিনায়—যে প্রতিষ্ঠান একসময় তাঁকে দিয়েছিল আশ্রয় ও আপন ঠিকানা।
শারমিনের বিয়েকে ঘিরে শিশু পরিবারজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। আয়োজনে অংশ নেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি, জেলা প্রশাসক, সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন। তাঁদের দোয়া, শুভকামনা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন নবদম্পতি।
শিশু পরিবারের বর্তমান বাসিন্দাদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক বাসিন্দারাও। তাঁদের উপস্থিতিতে বিয়ের আয়োজনটি পরিণত হয় আনন্দঘন এক মিলনমেলায়।
### পথ হারিয়ে ছাতকে
শারমিনের জন্ম ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ। তাঁর বাবার নাম জাকির মিয়া এবং মায়ের নাম হাছিনা বেগম। প্রায় ১২ বছর আগে, ২০১৪ সালে ছাতক থানায় করা একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সূত্র ধরে তাঁর বাবা-মায়ের নাম জানতে পারে সরকারি শিশু পরিবার কর্তৃপক্ষ।
এর আগে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চড়ে পথ হারিয়ে ছাতকে চলে এসেছিল ছোট্ট শারমিন।
ছাতক থানা পুলিশ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রথমে সিলেটের একটি সেইফ হোমে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ তাঁকে শিশু পরিবারে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তখন সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে কোনো আসন খালি না থাকায় ২০১৫ সালের ১৬ মার্চ তাঁকে শ্রীমঙ্গল সরকারি শিশু পরিবারে পাঠানো হয়।
সেখানে প্রায় দুই বছর থাকার পর সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে আসন খালি হলে শারমিনকে সেখানে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে এই প্রতিষ্ঠানেই কাটে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময়।
শিশু পরিবারের পাশের বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। একসময় যে প্রতিষ্ঠান ছিল তাঁর নিরাপদ আশ্রয়, ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর আপন ঠিকানা।
### নিজের পছন্দে জীবনসঙ্গী
বর্তমানে ১৯ বছর বয়সী শারমিন এবার নিজের পছন্দে জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছেন। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার পশ্চিম নিয়ামতপুর গ্রামের ইয়াকুব আলী ও নাছিমা আক্তারের ছেলে মুজাহিদুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থেকে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
২১ বছর বয়সী মুজাহিদুল সুনামগঞ্জ শহরে ছোটখাটো ব্যবসা করেন। তাঁদের সম্পর্কের পরিণতিতেই বিয়ের আয়োজন করা হয়।
শারমিনের বিয়েকে ঘিরে শিশু পরিবারের বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস। যেন পরিবারেরই একজন মেয়ের বিয়ে। প্রতিষ্ঠানটিতে থাকা ৫৭ জন শিশু-কিশোরীর পাশাপাশি অনুষ্ঠানে যোগ দেন সাবেক বাসিন্দারাও।
তাঁদের অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বাইরে রয়েছেন। দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও পারস্পরিক ভালোবাসার টানে তাঁদের উপস্থিতি বিয়ের আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
### প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক বিয়ে
সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারের ইতিহাসে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক বিয়ের আয়োজন এবারই প্রথম। ফলে শারমিনের বিয়ে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নতুন অধ্যায় নয়, প্রতিষ্ঠানটির জন্যও হয়ে উঠেছে স্মরণীয় একটি ঘটনা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের শিশু পরিবারের শারমিনের সঙ্গে মুজাহিদ ইসলামের বিবাহ সম্পন্ন হলো। সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা), জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অফিস এবং আমাদের এমপি মহোদয়সহ সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় বিয়েটি সম্পন্ন হওয়ায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত, গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের মহৎ একটি কাজে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। আমি বর ও কনের জন্য বিশেষ দোয়া করছি। তারা যেন দাম্পত্য জীবন সুখ ও শান্তিতে অতিবাহিত করতে পারে। এই আয়োজনের পেছনে যারা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের প্রতি আমার পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
একদিন যে মেয়েটি পথ হারিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছাতকে এসেছিল, আজ সেই মেয়েটিই পা রেখেছেন নতুন জীবনে। পেছনে রয়ে গেছে সরকারি শিশু পরিবারের স্নেহ-মমতায় ঘেরা শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি। সামনে নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব আর নতুন স্বপ্ন।
শারমিনের এই বিয়ে যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—আপন হয়ে ওঠার জন্য শুধু রক্তের সম্পর্কই যথেষ্ট নয়। ভালোবাসা, মমতা ও সহযোগিতার বন্ধনেও গড়ে উঠতে পারে একটি পরিবার। আর সেই পরিবারের ছায়াতেই একদিন আশ্রয় পাওয়া একটি মেয়ের জীবনে খুলে যেতে পারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।






















