টেকনাফে কৃত্রিম সার সংকটের জন্য উপজেলা কৃষি প্রশাসনকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা
কক্সবাজারের টেকনাফে সার সংকটকে ‘কৃত্রিম সংকট’ দাবি করে উপজেলা কৃষি প্রশাসনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী কৃষক ও সার ডিলাররা। সার বিক্রয়ে অনিয়ম, বরাদ্দে অসঙ্গতি এবং অভিযোগ থাকা কিছু ডিলারকে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অসংখ্য ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার বিক্রয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, কারসাজি ও সার পাচারের অভিযোগে কয়েকজন বিসিআইসি সার ডিলারকে টেকনাফ উপজেলা কৃষি অফিস থেকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, এরপরও সেপ্টেম্বর মাসের অতিরিক্ত বরাদ্দে ওই ডিলারদের মধ্যে কয়েকজনকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, যেসব ডিলারের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ নেই, তাদের কেউ কেউ অতিরিক্ত বরাদ্দ থেকে এক কেজি সারও পাননি। এতে বরাদ্দ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি অফিসারের দেওয়া একাধিক কারণ দর্শানোর নোটিশের তথ্য অনুযায়ী, হ্নীলার মৌলভী ইলিয়াসের মালিকানাধীন এম হোসেন ট্রেডার্স এবং হোয়াইক্যংয়ের মোস্তাক সওদাগরের মালিকানাধীন মেসার্স হোয়াইক্যং এন্টারপ্রাইজকে সার বিক্রয়ে অস্বাভাবিকতা ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক নোটিশ থাকার পরও অতিরিক্ত বরাদ্দে মেসার্স হোয়াইক্যং এন্টারপ্রাইজকে ২৮ মেট্রিক টন এবং এম হোসেন ট্রেডার্সকে ১৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়ার কারণ কী?
হ্নীলা ও হোয়াইক্যং এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে হ্নীলা এজেন্সি থেকে ন্যায্য মূল্যে সার কিনতেন। কিন্তু ওই এজেন্সিতে বরাদ্দ না থাকায় অন্য ডিলারদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পাওয়া যাচ্ছে না বলে তাদের অভিযোগ। ফলে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় চাষাবাদে কাঙ্ক্ষিত ফলন নিয়ে তারা শঙ্কিত।
এদিকে সার বরাদ্দের সুপারিশ নিয়ে উপজেলা কৃষি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিত এক সার ডিলার। তার অভিযোগ, অনিয়মের অভিযোগ থাকা ডিলারদের অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার পেছনে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর উখিয়া উপজেলার এক বিসিআইসি সার ডিলারের বিরুদ্ধে হ্নীলা এজেন্সির ডিলারশিপের কাগজপত্র জালিয়াতি করে ১৫ মেট্রিক টন সার নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সার কারখানা থেকে সার নিয়ে আসার পথে মরিচ্যা যৌথ চেকপোস্টে বিজিবি ওই সার আটক করে।
পরে হ্নীলা এজেন্সির মালিক জালাল উদ্দিন তার প্রকৃত ডিলারশিপের কাগজপত্র দেখিয়ে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা ও অভিযুক্ত ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং সার জব্দ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিষয়টি পরদিন টেকনাফ উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভাতেও উত্থাপন করেন হ্নীলা এজেন্সির মালিক জালাল উদ্দিন। এছাড়া অভিযুক্ত ডিলার সৈয়দ আহমদকে ১৫ দিনের মধ্যে স্বশরীরে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর জন্য আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, একজন ডিলারের বিরুদ্ধে অন্য ডিলারের ডিলারশিপের কাগজপত্র জালিয়াতি করে সার নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে যদি বরাদ্দে বাধা আসে, তাহলে সার বিক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগে বারবার সতর্ক করা ডিলাররা কীভাবে অতিরিক্ত বরাদ্দ পান?
কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের কারণে বাজারে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা এনসিপির কনভেনর মুহাম্মদ সায়েম সিকদার বলেন, “সারের যে সংকট দেখা দিয়েছে, সেটা আসলে সংকট নয়, এটি কৃত্রিম সংকট। কিছু মুনাফালোভী কর্মকর্তা ও আমলার কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ হতে হবে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, “যারা সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণ করে, তাদেরই বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেছি। তারা সার পাচার করেনি। বিক্রিতে কিছু গড়মিল পাওয়ায় তাদের সতর্ক করা হয়েছিল মাত্র। কেউ যদি সার পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সার সংকটের প্রকৃত কারণ, বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং অভিযোগ থাকা ডিলারদের অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা।

























