নারী কোটায় সার্ভেয়ার মরিয়মের ‘পারসেন্টেজ’ বাণিজ্য, ক্ষুব্ধ ক্ষতিগ্রস্তরা!
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা ও রেকর্ড রুমে দীর্ঘ দিন ধরে গেড়ে বসা সার্ভেয়ার মরিয়ম আক্তার রিপার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। নারী কোটার প্রভাব খাটিয়ে এবং একই শাখায় বছরের পর বছর বহাল থেকে তিনি একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও তাঁর এই অনিয়ম সিন্ডিকেট অপরিবর্তিত রয়েছ।
ডিসি অফিসের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পর পর সরকারি কর্মচারীদের বদলির নিয়ম থাকলেও মরিয়মের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি। নারী কোটার দোহাই এবং তদবিরের জোরে তিনি দীর্ঘদিন ধরে একই লাভজনক শাখায় খুঁটি গেড়ে বসে আছেন। এলএ শাখায় তার কাছে আসা যেকোনো ফাইলের ভাগ্য নির্ধারণ হয় তাঁর টেবিলে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প ‘পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর’ এর জন্য কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী, লালুয়া ও টিয়াখালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য তিনগুণ ক্ষতিপূরণের অর্থ বরাদ্দ করলেও, মরিয়মের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া কেউ চেক পেতেন না। জমির মালিকদের অভিযোগ, মোট ক্ষতিপূরণের অংকের ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত অগ্রিম ঘুষ বা পারসেন্টেজ দিতে হতো এই সার্ভেয়ারকে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইলের ভুল ধরা, জমির শ্রেণি পরিবর্তন নিয়ে জটিলতা তৈরি বা ভুয়া ওয়ারিশ দাঁড় করিয়ে প্রকৃত মালিকদের মাসের পর মাস হয়রানি করা হতো।
অভিযোগে জানা গেছে, বছরের পর বছর ধরে ফাইল জিম্মি ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে মরিয়ম বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। পটুয়াখালী শহরে তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কোটি টাকা মূল্যের একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক প্লট রয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। তাঁর স্বামী সোনালী ব্যাংক পটুয়াখালী শাখার ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত থাকায়, এই দম্পতি তাঁদের প্রভাব খাটিয়ে শহরে অত্যন্ত আলিশান জীবনযাপন করছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেল ও ছদ্মনামীয় অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নিরাপদে সরিয়ে ফেলা এবং বৈধ করার পেছনেও এই পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র কাজ করছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলেও মরিয়ম সিন্ডিকেট সচল রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি রাতারাতি নিজের খোলস বদলে ফেলেন এবং নতুন পরিস্থিতির সুবিধা নিয়ে আগের মতোই কার্যক্রম বজায় রাখেন। পূর্বের অনিয়ম ধামাচাপা দিতে এবং বন্দর এলাকার স্পর্শকাতর ফাইলগুলোর অডিট এড়াতে রেকর্ড রুমের কিছু নথিপত্র সরিয়ে ফেলার পেছনেও তাঁর হাত রয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে।
লালুয়া ইউনিয়ন থেকে আসা এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পায়রা পোর্টের জন্য আমাদের শেষ সম্বল চাষের জমিটুকু দিয়েছি। ডিসি অফিস থেকে ক্ষতিপূরণ তুলতে গেলে সার্ভেয়ার মরিয়ম আক্তার ও তাঁর সহযোগীরা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। ঘুষের টাকা জোগাড় করতে না পারায় আজ আমরা না পেয়েছি পুনর্বাসনের সঠিক সুবিধা, না পেয়েছি চেক। অথচ আমাদের টাকা মেরে তাঁরা শহরে আলিশান ফ্ল্যাটে থাকছেন।
পায়রা বন্দর এলাকার জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, মেগা প্রকল্পের ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ফাইল আটকে রেখে হয়রানি সহ্য করা হবে না। নির্দিষ্ট করে সার্ভেয়ার মরিয়ম ও এর সাথে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
























