সার ডিলার নিয়োগে নানামুখী অনিয়ম, এমপিরাও তদবিরে
দেশজুড়ে নতুন সার ডিলার নিয়োগকে ঘিরে তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীর নাম তালিকায় তোলার চেষ্টা, আবার কোথাও ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। এরই মধ্যে পছন্দের প্রার্থীদের ডিলার নিয়োগ দিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে তদবিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংসদ সদস্য (এমপি), রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও ডিলার প্রার্থীদের প্রতিনিধিরা।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখনো কোনো চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আবেদনকারীদের নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই চলছে। রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সরকার সারাদেশে প্রায় ৫ হাজার নতুন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৯৫টি। ফলে প্রতি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে ৯টি আবেদন পড়েছে। অর্থাৎ আবেদনকারীদের মাত্র প্রায় ৯ শতাংশের ডিলার হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গত ২৭ আগস্ট সার ডিলার নিয়োগে আবেদন আহ্বান করে কৃষি মন্ত্রণালয়। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অধিকাংশ আবেদনকারীই মৌলিক যোগ্যতা পূরণ করায় প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারাও বিভিন্ন মহল থেকে সুপারিশ পাচ্ছেন। পরিস্থিতির কারণে কেউ কেউ ফোনে সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
যেভাবে হবে ডিলার বাছাই
নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রাথমিক যাচাই শেষে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। পরে জেলা কমিটি যাচাই করে সেই তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠাবে।
কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একজনকে সার ডিলার হিসেবে মনোনয়ন দেবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই বাছাই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তালিকায় পরিবর্তনের চেষ্টা করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সচিবালয়ে তদবিরের ব্যস্ততা
গত ১০ সেপ্টেম্বর নতুন ডিলার নিয়োগের আবেদন জমা দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার পর থেকেই কৃষি মন্ত্রণালয়ে তদবিরকারীদের আনাগোনা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গত কয়েক দিনে কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের দপ্তরে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তাদের কেউ নিজ এলাকার আবেদনকারীর নাম নিয়ে আসছেন, কেউ সুপারিশপত্র ও ব্যবসায়িক কাগজপত্র নিয়ে যোগাযোগ করছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, গত রোববার থেকে চলতি সপ্তাহে অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ নিজ নিজ এলাকার পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে কথা বলেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তদবিরকারীদের মধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন। কেউ নিজের এলাকার প্রার্থীর পক্ষে সুপারিশ করছেন, আবার কেউ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বাছাইয়ে পছন্দের ব্যক্তির নাম রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
এমপি-জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশের অভিযোগ
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একজন সংসদ সদস্য তাঁর এলাকার একটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করে পাঠিয়েছিলেন। পরে ওই তিনজনের মধ্যে তালিকার প্রথম ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য একই সংসদ সদস্য আবার তদবির করেন বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।
নাটোরের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন টুলিকে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সচিবের দপ্তর থেকে বের হতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তাঁদের হাতে ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র ছিল। তিনি তাঁর এলাকার ডিলার নিয়োগ নিয়ে সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেন বলে জানা গেছে।
বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানকেও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সচিবের দপ্তর থেকে বের হতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তাঁর হাতেও ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র ছিল।
ভোলা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ব্যবসায়ী কবীর মৃধাও নতুন ডিলারের জন্য আবেদন করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স কবীর মৃধা। ডিলার নিয়োগের বিষয়ে কথা বলতে তিনি সচিবের দপ্তরের আশপাশে গেলেও সাক্ষাৎ করতে পারেননি বলে জানান।
রংপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মাসুদ রানাও ডিলার নিয়োগের বিষয়ে সচিবালয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁর স্ত্রী সার ডিলারের জন্য আবেদন করেছেন এবং তাঁকে নিয়োগের বিষয়ে কথা বলতেই তিনি মন্ত্রণালয়ে এসেছেন। তাঁর স্ত্রীর নাম জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো তিনজনের তালিকায় রয়েছে বলেও জানান তিনি।
যোগ্যতার বদলে প্রভাবের আশঙ্কা
সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা দেওয়া একটি সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে নতুন সার ডিলার নিয়োগে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশের কারণে যোগ্যতার পরিবর্তে অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ পাওয়ার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ দিতে প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে। এ ধরনের প্রভাব কার্যকর হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ডিলার হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অবস্থান হলো, নির্ধারিত নীতিমালা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই নতুন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে এবং রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ নেই।






















