বাকৃবিতে বিশ্ব ডিম দিবস পালিত: বিনামূল্যে ডিম বিতরণ ও আনন্দ র্যালি
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে এবং ওয়ার্ল্ড পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন- বাংলাদেশ শাখার (ডব্লিউপিএসএ-বিবি) যৌথ আয়োজনে বিশ্ব ডিম দিবস ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে । সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ৯টায় দিবসটি উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে ৪হাজার ডিম বিতরণ করা হয়। ডিম বিতরণ শেষে সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষদের গেটের সামনে বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়। র্যালিটি পশুপালন অনুষদের সামনে থেকে শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে এসে শেষ হয়।
র্যালি শেষে সকাল সাড়ে ১০টায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ডব্লিউপিএসএ বাংলাদেশ শাখার সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. জি. এম. মুজিবর রহমান। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনিম্যাল হাজবেন্ড্রির ডিন অধ্যাপক ড. মো. রকিবুল ইসলাম খান। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডব্লিউপিএসএ বাংলাদেশ শাখার জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মো. সিরাজুল হক, পোলট্রি কনসালট্যান্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রফিকুল হক এবং সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফয়জুর রহমানসহ পশুপালন অনুষদের শিক্ষক, শিক্ষার্থীবৃন্দ সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন ।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বাপন দে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘প্রোটিন যা শক্তি জোগায় ও সুরক্ষা দেয়’। এসময় তিনি বলেন, ২০২৪ সালে বিশ্বে উৎপাদিত প্রায় ১০ কোটি মেট্রিক টন ডিমের এককভাবে এশিয়া অঞ্চল থেকে এসেছিল প্রায় ৬০শতাংশ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ৪৪০ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৫০৯ কোটি ডিম। বর্তমানে একজন মানুষের জন্য বছরে গড়ে প্রায় ১৩৭টি ডিমের প্রাপ্যতা রয়েছে, যেখানে বার্ষিক চাহিদা ধরা হয়েছে ১০৪টি।
তিনি আরও বলেন, ডিম সহজলভ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের উৎস। এতে উচ্চমানের প্রোটিন, প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, কোলিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ, দৃষ্টিশক্তি রক্ষা এবং হাড় ও দাঁতের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেকেই কোলেস্টেরলের ভয়ে ডিমের কুসুম খাওয়া এড়িয়ে চলেন। অথচ ডিমের কুসুমে প্রোটিন, ভিটামিন, কোলিন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তাই ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাস বিবেচনায় ডিমের সাদা অংশের পাশাপাশি কুসুমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
দিবসটি উপলক্ষে তিনটি ক্যাটেগরিতে আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ী ৯ জনের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পরে অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথিদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে ডব্লিউপিএসএ বাংলাদেশ শাখার সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী বলেন, আমাদের খাদ্যতালিকায় অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড রাখতে হয়, যা আমরা প্রাণিজ প্রোটিন থেকে পাই। এর অন্যতম প্রধান উৎস হলো ডিম, দুধ ও মাংস। এসবের মধ্যে ডিমের প্রোটিনের গুণগত মান সবচেয়ে ভালো। পাশাপাশি এর দামও তুলনামূলক কম। ২৫ গ্রাম প্রোটিন পেতে ডিমের পেছনে খরচ হয় ৪০ টাকা, যেখানে মাংসের ক্ষেত্রে খরচ হয় ৮০ টাকা। ডিমকে সরকারের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। বর্তমানে ডিম উৎপাদনে উৎপাদকদের প্রতি ডিমে ১০ টাকার বেশি খরচ বহন করতে হয়। তাই এ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে।
প্রধান পৃষ্ঠপোষক অধ্যাপক ড. মো. রকিবুল ইসলাম খান বলেন, ডিম অন্যান্য খাবারের তুলনায় খুব সহজেই প্রক্রিয়াজাত করে খাওয়ার উপযোগী করা যায়। ডিমকে রেডি-টু-ইট খাবার হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ অনেকেই সেদ্ধ ডিম খেতে পছন্দ করেন না। বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে ডিম বিক্রি হতে দেখা যায়। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে ডিম বিক্রির ব্যবস্থা থাকলে তা আরও ভালো হতো। ভবিষ্যতে ছোট ছোট খামারের পক্ষে উৎপাদিত ডিম সরাসরি বাইরে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে এ খাতে শিল্পায়ন বাড়বে এবং ডিম উৎপাদনব্যবস্থা আরও আধুনিকায়ন করতে হবে।
প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. জি. এম. মুজিবর রহমান বলেন, মানুষকে ডিম সম্পর্কে সচেতন করার প্রয়োাজন তুলনামূলক কম। কারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ডিম কিনছে ও গ্রহণ করছে। তাই ডিমের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমানে আমাদের প্রতিদিনের চাহিদা ৬ কোটি ডিম। ডিমের উৎপাদন বাড়লে এবং দাম কমলে মানুষের ডিম খাওয়ার পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। এ জন্য আমাদের উদ্যোক্তা তৈরি করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার উদ্যোক্তা তৈরিতে নানা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারলে ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।মুরগির খাবার সহজলভ্য করা এবং খাবারের দাম কমানোর মাধ্যমে ডিমের দাম কমানো সম্ভব। ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে।


























