চৌদ্দগ্রামে হত্যার ২০ বছর পর পুনরায় তদন্তের জন্য দাবী নিহতের পরিবারের!
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ধারালো চুরি দিয়ে জবাই করে স্কুলছাত্র কামাল হোসেনকে হত্যার ২০ বছর পর পুনরায় তদন্তের জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানাবেন নিহতের পরিবার। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে সাবেক রেলপথ মন্ত্রীর নির্দেশে দেয়া চার্জশীটের পূনরায় তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত বলে দাবী জানিয়েছেন নিহত কামালের পরিবার। ২০১১ সালের ২১ শে এপ্রিল সাবেক রেলপথ মন্ত্রীর নির্দেশে সিআইডির দেয়া মনগড়া চার্জশীটের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়ে মামলাটি পুনরায় তদন্ত করলে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছেন মামলার বাদী আনোয়ার হোসেন। মামলার প্রধান আসামী আবদুল মালেক সহ অন্যান্য আসামী ঘনিষ্ঠ আপন লোক হওয়ায়- ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক মুজিব বাদীকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য- সরাসরি প্রস্তাব দেয়। প্রতিউত্তরে হত্যাকারীদের রেহাই দেয়া হবে না বলে সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থানে থাকলে, রেলপথ মন্ত্রী মুজিুল হক তাৎক্ষণাৎ বাদী আনোয়ার হোসেনকে আপোষের স্বার্থে নগদ ৩০ লক্ষ টাকা দেয়ার কথা বলে। মন্ত্রীর প্রস্তাবে অস্বীকৃতি প্রকাশ করলে তাৎক্ষণাৎ বাদীর সামনে হত্যাকারীদেরকে মামলা থেকে রেহাই পেতে এবং আসামীদেরকে পর্যায়ক্রমে খালাস পাওয়ার সুযোগ রেখে, চার্জশীট দেয়ার জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়। রেলমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামীদের পক্ষে আদালতে চারজশীট প্রদান করে। এরপর থেকেই আসামীরা বীরদর্পে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে। ইতিমধ্যে আসামীরা প্রকাশ্য দিবালোকে নিহত কামাল হোসেনের প্রবাস ফেরৎ আরেক ভাই দেলোয়ার হোসেনকেও একই কায়দায় জবাই করে হত্যা করার হুমকি ধমকি দিয়ে আসছে বলে সূত্র জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রেম করার অপরাধে ভাড়াটিয়া খুনিদের সহযোগিতায় নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে দশম শ্রেণীর ছাত্র কামাল হোসেন (১৮)কে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার চাঞ্চল্যকর স্কুল ছাত্র কামাল হত্যার মামলার ভবিষ্যৎ এখন অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আসামিদের অব্যাহত হুমকির মুখে চরম নিরাপত্তাহীনতা দিন কাটাচ্ছেন বাদী ও তার পরিবার। এদিকে নিহত কামাল হত্যা ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন কিন্তু আজও মামলাটির সুষ্ঠু তদন্ত করতে পারেনি। হত্যাকারীদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে বারবার আইনের আশ্রয় চেয়েও রেলমন্ত্রীর দাপটের ফলে কোনো প্রতিকার পায়নি নিহত কামালের পরিবার। জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২২ আগস্ট প্রেম করার অপরাধে ভাড়াটিয়া খুনিদের সহযোগিতায় নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে কামালকে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এবং আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে এই খুনের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা শুভপুর ইউনিয়ন জুপুয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম ওরফে তোরাব আলী ড্রাইভারের ছেলে কামাল হোসেনকে ২২ শে আগস্ট রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যার পর, লাশ ধান ক্ষেতের ড্রেনে ফেলে যায় হত্যাকারীরা। নিহত কামালের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট চৌদ্দগ্রাম থানায় একটি মামলা দায়ের করেন (যার নং ২৬)। এ মামলায় সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে জুপুয়া গ্রামের আবুল কালাম আবু, সাইফুল ইসলাম, মান্দারিয়া গ্রামের শাহাদাৎ হোসেন লিটন, জন্তুর আলীকে গ্রেফতার করে। পুলিশে জিজ্ঞাসা বাদে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ হত্যার রহস্য বেরিয়ে আসে। রিমান্ডে পুলিশে জিজ্ঞাসাবাদে এবং ১৬৪ ধারা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তিতে শাহাদাত হোসেন লিটন জানায়, ঘটনা নয় মাস পূর্বে আমি ঢাকায় বিয়ে করার পর নববধূকে নিয়ে খুলনা তার বোনের বাসায় বেড়াতে যাই। ১৯ শে আগস্ট খুলনা থেকে বাড়িতে ফিরে আসি। জুপুয়া গ্রামের কামাল হোসেনের সাথে আমার জেঠাতো বোন জোসনার সাথে প্রেম করার কথা আমি জানতাম। জ্যাঠাতো ভাই মালেক ঢাকায় থাকে। আমি খুলনা থেকে ফিরে তাকে বাড়িতে দেখতে পাই। ২০ শে আগস্ট মালেক আমাকে ডেকে নিয়ে বলে যে, লিটন একটা কাজ করে দিতে পারবি। আমি বলি কি কাজ। মালেক বলে জুপুয়া গ্রামের কামাল হোসেন আমার বোনের সাথে প্রেম করে। তারপর সে আমাকে ৫০০ টাকা দিয়ে কামালকে তার বাড়ি থেকে ডেকে আনার জন্য বলে। পরদিন মালেক ঢাকা যায়। এরপর দিন বিকাল তিনটায় মালেক ঢাকা থেকে ফেরত আসে। মালেকের সাথে ঢাকা থেকে ৪ জন ছেলে আসে। আমি মালেকের কাছে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে মালেক তাদেরকে তার বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেয়। আমি তাদের নাম জিজ্ঞাসা করলে তারা তাদের নাম রিপন, সাজু, ইমন ও জনি বলে পরিচয় দেয়। মালেক আমাকে কামালের বিষয়ে কি করেছি জিজ্ঞাসা করে। আমি বলি কিছুই করতে পারেনি। মালেক বলে সে পাশের বাড়ির হাসানকে কামালের মোবাইল ফোন নাম্বার এনে দেওয়ার জন্য বলেছে। তারপর আমি সহ তারা পাঁচজন হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড়ের দিকে যাই। তখন সন্ধ্যা ৬টা বাজে। মালেক নিজের মোবাইল দিয়ে কামাল কে ফোন করে কামাল কোথায় আছে জিজ্ঞাসা করে। প্রতিউত্তরে কামাল বাড়িতে আছে বলে জানায়। মালেককে আমি কামালের জন্য এত অস্থির হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করি। মালেক বলে কামাল আসলে তাকে বন্ধুবান্ধব সহ হালকা মারধর করা হবে। মালেক বলে তারা কামালদের গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের ডান পাশের দোকানে চা খাবে, আমি যেন কামালকে সেখানে ডেকে নিয়ে যাই। মালেক তার বন্ধুরা ওই দোকানের কাছে বাঁশ ঝাড়ের নিচে দাঁড়ায়। তখন আমি কামালদের বাড়িতে গিয়ে কামালকে ডাক দিই। কামাল ঘর থেকে বের হয়। আমি কামালকে ডেকে মালেকদের কাছে নিয়ে যাই। সেখানে কামালকে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মালেকের বন্ধুরা কামালের হাত মুখ চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলে। আমি মালেকের নিকট কামালকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলি। প্রতি উত্তরে মালেক আমাকে চলে যেতে বলে। তারপর মালেকসহ পাঁচজন কামালকে নিয়ে জুপুয়া পুকুর পাড়ের দিকে যায়। দোকানে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জুপুয়া গ্রামের আবু তাদেরকে দেখে। আবু মালেককে জিজ্ঞাসা করে কামালকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? প্রতিউত্তরে মালেক বলে আপনি চুপ থাকেন আমি আপনার সাথে পরে কথা বলবো। আমি তাদের পিছনে পিছনে যাই। তখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। কামালকে তারা জুফুয়া উচু পুকুর পাড়ের কাছে নিয়ে জমিতে নামে। আমি তখন পুকুরপাড়ে তাল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকি। কামালকে ধান ক্ষেতে ড্রেনে দিয়ে জমির মাঝখানে নিয়ে যায়। আমি হামাগুড়ি দিয়ে তাদের পিছন পিছন গিয়ে ২০ হাত দূরে বসে থাকি। মালেকের টচ লাইটের আলোতে দেখতে পাই যে, রিপন কামালকে লাথি মেরে ড্রেনে ফেলে দেয়। তখন রিপন, সাজু, ইমন ও জনি কামালকে মাটিতে চেপে ধরে। মালেক কামালের পেটে পা দিয়ে চেপে ধরে। বিজলীরে আলোতে দেখি রিপন একটি ছুরি বের করে কামালকে জবাই করে। কামালের মৃত্যুর পর জনি কামালের পা ধরে টেনে জমির আরো মাঝখানের দিকে একটি উঁচু জমির পাশে নিয়ে রাখে। তারপর মালেকসহ সবাই চলে যায় আমিও বাড়িতে চলে যাই।

























