ঢাকার দোহারে বাণিজ্যিকভাবে সাড়া ফেলছে ‘আঁশ ফল’
ফলের রাজ্যে কত রকমের অদ্ভুত নাম আর বৈশিষ্ট্যের ফল রয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তবে এমন একটি ফলের নাম যদি হয় ‘আঁশ ফল’ অথচ যার ভেতরে কোনো আঁশ বা তন্তু-ই নেই, তবে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। জিভে পানি আনা মিষ্টি ও সুস্বাদু এই ফলটি আমাদের দেশে অনেকের কাছে ‘আঁশ ফল’ নামে পরিচিত হলেও, এটি মূলত লিচুরই একটি ছোট সংস্করণ বা জাতভাই। গ্রামীণ জনপদে একে অনেকে ‘কাঠলিচু’ বা ‘লংগান’ (Longan) নামেও ডেকে থাকেন।
ফলটির ভেতরে কোনো আঁশ না থাকলেও কেন এর নাম ‘আঁশ ফল’ হলো, তা নিয়ে উদ্ভিদবিদ ও লোক গবেষকদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। মূলত ফলটির ওপরের চামড়া বা খোসাটি কিছুটা খসখসে এবং দেখতে আঁশের মতো টেক্সচারযুক্ত হওয়ায় লোকমুখে এর নাম হয়ে যায় ‘আঁশ ফল’।
এটি দেখতে অবিকল ছোট আকৃতির লিচুর মতো। পাকা আঁশ ফলের ওপরের চামড়াটি হালকা বাদামি বা তামাটে রঙের হয়ে থাকে। খোসাটি ছাড়ালেই ভেতরে দেখা যায় সাদা, আধা-স্বচ্ছ এবং রসালো শাঁস, যা খেতে অত্যন্ত মিষ্টি ও সুঘ্রাণযুক্ত। এই শাঁসের ভেতরে থাকে একটি কুচকুচে কালো বা গাঢ় বাদামি রঙের বীজ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো চেনা পাখির চোখ, তাই চীনা ভাষায় একে বলা হয় ‘লংগান’, যার অর্থ ‘ড্রাগনের চোখ’।
আঁশ ফলের অন্যতম বড়ো শত্রু হলো বাদুড়। এই ফলের ওপর বাদুড়ের ব্যাপক উপদ্রব লক্ষ্য করা যায়। গাছের মিষ্টি ফলের গন্ধ পেলে বাদুড়ের দল হানা দেয় এবং কোনো গাছে একবার নজর পড়লে মাত্র এক রাতেই পুরো গাছের ফল সাবাড় বা ধ্বংস করে ফেলে। এই উপদ্রব ও লোকসান থেকে বাঁচতে স্থানীয় চাষি ও বাগান মালিকদের পুরো গাছ নেট বা জাল দিয়ে ঢেকে রাখতে দেখা যায়।
এক সময় অবহেলিত থাকলেও এখন এই ফলকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড়ো অঙ্কের ব্যাবসা হচ্ছে। জামালচর গ্রামের স্থানীয় চাষি পলাশ জানান, তিনি তার বাড়ির ১২টি গাছের ফল ৬০ হাজার টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করেছেন।
অন্যদিকে, করিমগঞ্জ থেকে আসা ফল ব্যবসায়ী শামীম জানান, তিনি দোহারের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে প্রায় ৫ লাখ টাকার আঁশ ফলের গাছ (ফলসহ) অগ্রিম কিনে নিয়েছেন। ফলগুলো পুরোপুরি পরিপক্ব বা পাকা হয়ে গেলে তিনি গাছ থেকে তা সংগ্রহ করে ঢাকার বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করবেন। তিনি প্রতি বছরই মৌসুম অনুযায়ী আঁশ ফলসহ অন্যান্য দেশীয় ফল কিনে এভাবে ব্যাবসা করে থাকেন।
আঁশ ফল কেবল খেতেই সুস্বাদু নয়, এর রয়েছে চমৎকার সব ঔষধি ও পুষ্টিগুণ, এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ফলটিতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বার্ধক্য রোধে এবং শরীরের কোশ সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। রক্তশূন্যতা দূর করতে এবং শরীরের ঝিমুনি বা ক্লান্তিভাব কাটাতে এর খনিজ উপাদানগুলো দারুণ সাহায্য করে। ঐতিহ্যগত চীনা চিকিৎসায় এই ফলটিকে মানুষের মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমাতে এবং অনিদ্রার সমস্যা দূর করতে ব্যবহার করা হয়।
এক সময় বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের ঝোপঝাড়ে বা বাড়ির আনাচে-কানাচে প্রাকৃতিকভাবেই এই আঁশ, ফল বা কাঠ লিচুর গাছ দেখা যেত। প্রতি বছর মে-জুন মাসের দিকে বাজারে এই ফলের দেখা মেলে। তবে লিচু বা আমের মতো বাণিজ্যিকভাবে এর চাষাবাদ আমাদের দেশে এখনো সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটাপন্ন সময়ে আঁশ ফল চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এই গাছটি বেশ শক্তপোক্ত এবং লিচুর তুলনায় অনেক কম পরিচর্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়াতেও সহজে টিকে থাকতে পারে। সেই সাথে এই গাছে ফলনও হয় প্রচুর।
নামের বৈচিত্র্য আর স্বাদের অনন্যতার কারণে এই ‘আঁশহীন’ আঁশ ফল নতুন প্রজন্মের কাছেও দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাড়ির ছাদবাগান বা পতিত জমিতে আধুনিক ও বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ বাড়াতে পারলে দেশীয় ফলের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক লাভবান হতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।















