ডুমস্ক্রলিংয়ে বাড়ছে মানসিক ঝুঁকি, ব্যাহত হচ্ছে সুস্থ জীবন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢোকার পর অজান্তেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করে যাওয়ার প্রবণতা এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষক ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, রিল-আসক্তি এবং নেতিবাচক খবরের পেছনে অবিরাম ছুটে চলা বা ‘ডুমস্ক্রলিং’ এক নয়, তবে এ দুটি আচরণ মনস্তাত্ত্বিকভাবে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মনোশিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের প্রকাশিত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নোটিফিকেশন না থাকলেও বারবার ফোন চেক করার অভ্যাস মূলত এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর ডিজিটাল নির্ভরতা। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষের ঘুমের স্বাভাবিক চক্র, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (Blue Light) মেলাটোনিন হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করে, যা ঘুমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উদ্বেগজনক ও সংবেদনশীল খবর দীর্ঘ সময় ধরে দেখার ফলে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থায় থাকে। ফলে শরীর ক্লান্ত হলেও সহজে ঘুম আসে না।
অন্যদিকে, অ্যালগরিদমনির্ভর ছোট ভিডিও বা রিলস একের পর এক দেখার ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এতে নতুন তথ্য বা নতুন কনটেন্ট দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। ফলস্বরূপ মানুষ সচেতনভাবে তথ্য গ্রহণের পরিবর্তে অবচেতনভাবেই তথ্যের স্রোতে ভেসে যেতে থাকে এবং ধীরে ধীরে বাস্তব জীবন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়া, রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে চোখ রাখা, কাজের সময় বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে পড়া কিংবা মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা—এসবই ডুমস্ক্রলিংয়ের প্রাথমিক লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এ অভ্যাস অব্যাহত থাকলে দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা, মাথাব্যথা, চোখের অবসাদ, মনোযোগের ঘাটতি এবং সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয়সহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। যদিও ডুমস্ক্রলিংকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বতন্ত্র মানসিক ব্যাধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, তবুও এটিকে আসক্তিমূলক আচরণ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
তাদের মতে, সমাধান প্রযুক্তি পুরোপুরি বর্জন নয়; বরং সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রাখা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, অ্যাপ টাইমার ব্যবহার করা এবং অবসর সময়ে বই পড়া, শারীরিক ব্যায়াম বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তুললে ডুমস্ক্রলিংয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য—জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়। তাই সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য ও সুষম জীবনযাপনের স্বার্থে এখনই প্রয়োজন ডিজিটাল ব্যবহারে সচেতনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ।



























