তরুণদের স্বপ্ন পূরণের ব্যর্থতায় উন্নয়নও অপূর্ণ!
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অবকাঠামো, প্রযুক্তি, অর্থনীতি কিংবা সামাজিক অগ্রগতি—সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—এই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে কি আমাদের তরুণরা আছে? যদি দেশের তরুণ-তরুণীদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও সক্ষমতার বিকাশ না ঘটে, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য—”তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রস্তুতিতে সুন্দর আগামী গড়ি”—আমাদের সেই বাস্তবতাই স্মরণ করিয়ে দেয়। জনসংখ্যা তখনই সম্পদে পরিণত হয়, যখন তারা শিক্ষিত, দক্ষ, সুস্থ, সৃজনশীল এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রধান প্রত্যাশা হলো দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান, মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব। তারা এমন একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চায়, যেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে। কারণ একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজই তরুণদের আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল করে তোলে।
আজকের তরুণদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান। শুধু সনদ অর্জন নয়, বাস্তবমুখী শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে মেধা, সততা ও পরিশ্রমই হবে সফলতার একমাত্র মানদণ্ড।
স্বাস্থ্যসেবাও তরুণদের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। অপুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার অসম প্রাপ্যতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। একটি সুস্থ প্রজন্ম ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হতে পারে না।
অন্যদিকে বাল্যবিবাহ, কিশোরী মাতৃত্ব, শিক্ষাঝরে পড়া, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব এবং দুর্নীতির মতো সমস্যাগুলো অসংখ্য তরুণ-তরুণীর স্বপ্নকে অকালেই থামিয়ে দেয়। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি।
তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে তারাই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে। এজন্য প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ অর্থায়ন, উদ্ভাবনী উদ্যোগে সহায়তা এবং বৈষম্যহীন সুযোগ নিশ্চিত করা।
উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন শহর-গ্রাম, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব—সব তরুণ সমান সুযোগ পাবে। প্রতিটি তরুণ যদি নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়, তাহলে তার সুফল ভোগ করবে পুরো জাতি।
তাই উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের উন্নয়ন, বিশেষ করে তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, স্বাধীন চিন্তা এবং নৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আজকের তরুণদের স্বপ্নই আগামী দিনের বাংলাদেশের ভিত্তি।
তরুণদের স্বপ্ন পূরণে বিনিয়োগ মানেই দেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হলে উন্নয়নের সব অর্জনই অপূর্ণ থেকে যাবে। একটি দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেই হবে। কারণ তারাই আগামীর বাংলাদেশ, আর তাদের হাত ধরেই রচিত হবে একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যৎ।
মিয়া সুলেমান, ঈশ্বরগঞ্জ:
লেখক- শিক্ষানুরাগী ও গণমাধ্যমকর্মী

























