সুনামগঞ্জে কোটি টাকার সঞ্চয় নিয়ে উধাও ‘পল্লী বন্ধু উন্নয়ন সংস্থা’ সর্বস্ব হারিয়ে পথে শত শত গ্রাহক
অধিক মুনাফা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলার শত শত গ্রাহকের কাছ থেকে ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) ও দৈনিক সঞ্চয়ের নামে কয়েক কোটি টাকা সংগ্রহের পর উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘পল্লী বন্ধু উন্নয়ন সংস্থা’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও)-এর বিরুদ্ধে।
হঠাৎ করেই একাধিক শাখা কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে কর্মকর্তাদের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় চার বছর ধরে অধিক মুনাফা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় সংগ্রহ করে আসছিল সংস্থাটি।
কিন্তু সম্প্রতি গ্রাহকরা মেয়াদপূর্তির টাকা কিংবা জমাকৃত সঞ্চয় ফেরত চাইলে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। পরে একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক শাখা কার্যালয় তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
জামালগঞ্জ উপজেলার মাঠকর্মী সীমা রানী সরকার জানান, গত চার বছরে তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে শাখা ব্যবস্থাপক জেসমিন আক্তারের কাছে জমা দিয়েছেন। কিন্তু গত শুক্রবার অফিসে গিয়ে তিনি তালাবদ্ধ দেখতে পান। বারবার ফোন করেও ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।
তিনি বলেন, মানুষের কষ্টার্জিত টাকা নিয়ে কীভাবে তাদের মুখোমুখি হবো বুঝতে পারছি না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সদর উপজেলার জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা সিতিশ রায় জানান, তিনি সংস্থাটিতে ৫০ হাজার টাকা ফিক্সড ডিপোজিট এবং ১০ হাজার ৩০০ টাকা দৈনিক সঞ্চয় হিসেবে জমা রেখেছিলেন। মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত চাইলে মাঠকর্মী তামান্না শেখ ও শাখা ব্যবস্থাপক আল-আমিন খান নানা অজুহাতে ঘুরিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। পরে অফিসে গিয়ে দেখেন সেখানে তালা ঝুলছে।
একই গ্রামের প্রণয় দাশ বলেন, তিনি ৩৫ হাজার টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। চলতি বছরের ২০ জুলাই ওই সঞ্চয়ের বিপরীতে এক লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত দিনে অফিসে গিয়ে দেখেন সেটি বন্ধ। তিনি বলেন, “আমরা এখন থানায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু সদর উপজেলা নয়, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একইভাবে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে সংস্থাটির সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে গেছেন।
এদিকে সরেজমিনে শহরের ওয়েজখালী এলাকায় অবস্থিত সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একজন অফিস সহকারী ছাড়া কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা উপস্থিত নেই। তবে শান্তিগঞ্জের পাগলা, তাহিরপুর, ছাতক ও দিরাই উপজেলার কয়েকটি শাখায় এখনও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা না হলে আরও অনেক মানুষ প্রতারণার শিকার হতে পারেন।
অভিযোগের বিষয়ে সংস্থাটির উপ-পরিচালক জামিরুল হক বলেন, সুনামগঞ্জে আমাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। কয়েকটি শাখায় সাময়িক সমস্যা হয়েছে। খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান করে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ বলেন, বিষয়টি আমরা জেনেছি। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্লী রানী মোদক বলেন, সংস্থাটির বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পেয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে গ্রাহকদের টাকা উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এস এম মিজান
সুনামগঞ্জ

























