সরকারি ভাতার ১,৭০৯ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ, ‘নগদ’-এর ৭৮৬ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ
সরকারি বিভিন্ন ভাতার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ‘নগদ’-এর মাধ্যমে ভয়ংকর কারসাজির প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের অনুসন্ধানে ২৪ হাজার ১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেট, ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসও এবং ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৭০৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন ভাতার ৩২ হাজার ৬৫০ কোটি ৭৬ লাখ ৪৮ হাজার ২৫৪ টাকা ‘নগদ’-এর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ভাতাভোগীদের একটি অংশ এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে টাকা উত্তোলন করেননি। অভিযোগ রয়েছে, সফটওয়্যার কারসাজির মাধ্যমে এসব পড়ে থাকা অর্থ ভুয়া ওয়ালেটে সরিয়ে নেওয়া হয়।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রথমে মৃত, নিষ্ক্রিয় কিংবা বিভিন্ন কারণে টাকা উত্তোলন না করা গ্রাহকদের ওয়ালেট থেকে অর্থ ২৪ হাজার ১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেটে স্থানান্তর করা হয়। পরে এসব অর্থ ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসওর ওয়ালেটে যায়। সেখান থেকে ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়।
দুদকের দাবি, এভাবে ‘ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট’ হিসাব থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০৯ কোটি ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার ২২৯ টাকা বের করে আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে বিপুল অর্থ
অর্থ সরানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মধ্যে অন্তত আটটির নাম দুদকের নথিতে উঠে এসেছে। এগুলো হলো—অ্যাস্থেটিক ডেভেলপমেন্ট, এআরএ ডেভেলপার, ডিজিটাল সেন্টার ডিস্ট্রিবিউশন, কল্লোল ডিস্ট্রিবিউশন, এলবি নিটওয়্যার, পাইনউড ডিস্ট্রিবিউশন, রহমান ডিস্ট্রিবিউশন ও ইউডিসি ডিস্ট্রিবিউশন।
দুদক সূত্রের ভাষ্য, এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করা হয়। পরে বিভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে স্তরে স্তরে অর্থ স্থানান্তর করে তা ঘোরানো হয়।
লোপাটের অর্থে কেনা হয় ‘নগদ’-এর শেয়ার
দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বিভিন্ন হিসাবে ঘোরানো অর্থের একটি অংশ দিয়ে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের—পরিবর্তিত নাম নগদ লিমিটেড—১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার কেনা হয়। এসব শেয়ারের মূল্য প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা।
দুদকের ধারণা, সরকারি ভাতার অর্থ আত্মসাতের পর তা সরাসরি না রেখে শেয়ারে রূপান্তর করা হয়েছে।
তানভীর মিশুকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য
অনুসন্ধানে ‘নগদ’ পরিচালনাকারী থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।
তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ছাড়াও বৈধ চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা না এনে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে শেয়ার হস্তান্তর, শূন্য কুপন বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত মূলধন দিয়ে বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং নিজ ও স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
দুদক জানায়, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বরের একটি চুক্তির মাধ্যমে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসকে ‘নগদ’ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাস্টার এজেন্ট নিয়োগ করে। চুক্তি অনুযায়ী রাজস্বের ৫১ শতাংশ ডাক বিভাগ এবং ৪৯ শতাংশ থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসের পাওয়ার কথা ছিল।
পরবর্তীতে মাস্টার এজেন্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ‘নগদ’-এর কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসক নিয়োগ করে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে শেয়ার দেখানোর অভিযোগ
দুদক বলছে, লোপাটের অর্থে কেনা শেয়ারগুলো পরবর্তী সময়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের নামে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এ ক্ষেত্রে চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার হোল্ডিংস, মিয়ার্স হোল্ডিংস, সেঞ্চুরি অনলাইন, চৌধুরী বেঙ্গল ফিনটেক, ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস, তাসিয়া হোল্ডিংস, চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার ম্যানেজমেন্ট, ফিনটেক হোল্ডিংস, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স ও ইএসওপি হোল্ডিংসের নামে শেয়ারের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে এসব বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা নাগরিকের মাধ্যমে শেয়ার কেনার অর্থের বৈধ উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে কমিশন। শেয়ার বিক্রি করে অর্থ বিদেশে পাচারের চেষ্টার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে দুদক।
৭৮৬ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ
অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে এসব শেয়ার বিক্রি, হস্তান্তর বা স্থানান্তর করা হলে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছে দুদক। এ কারণে তানভীর আহমেদ মিশুকসহ অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার অবরুদ্ধ করার আবেদন করা হয়।
দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা মূল্যের এসব শেয়ার অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন। একই সঙ্গে শেয়ারগুলো হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর বা বিক্রি বন্ধ রাখার আবেদন করা হয়।
আদালতের আদেশের কপি যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর, ‘নগদ’-এর প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর আবেদনও করেছে দুদক।
এ বিষয়ে তানভীর আহমেদ মিশুকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানা যায়। তার বিদেশি নম্বরে ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।






















