চট্টগ্রামের এক পরিবারের চার ভাই বুয়েটের ছাত্র
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পোমরা ইউনিয়নের ছাইনীপাড়া গ্রাম। এই গ্রামের একটি পরিবারে চার ভাইয়ের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের নাম। বড় ভাই হাসান মনির থেকে শুরু করে মেজো ভাই হাসান মুরাদ, সেজো ভাই হাসান মাসুম এবং ছোট ভাই হাসান মামুন। চার ভাইই বুয়েটে পড়েছেন বা পড়ছেন। একই পরিবারের সদস্যরা টানা ১৬ থেকে ১৭ বছর ধরে বুয়েটে পড়েছেন। ২০২২ সালে ছোট ভাই হাসান মামুনের লেখা প্রথম আলোর প্রতিবেদনে এই ধারাবাহিকতার কথা উঠে আসে।
এই যাত্রার শুরু ২০০৯ সালে। সে বছর বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় ৫৭তম হয়ে ভর্তি হন বড় ভাই হাসান মনির। তখন পরিবারের অন্যরা হয়তো ভাবেননি, একসময় চার ভাইয়ের সবার শিক্ষাজীবনের ঠিকানা হবে একই বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এরপর একে একে সেই পথেই হাঁটেন অন্য তিন ভাই।
মেজো ভাই হাসান মুরাদ ২০১৩ সালে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় ৭৪তম হয়ে সুযোগ পান। এরপর ২০১৮ সালে সেজো ভাই হাসান মাসুম ৮০তম হয়ে বুয়েটে ভর্তি হন। সর্বশেষ ২০২১ থেকে ২০২২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় ৩২৪তম হয়ে বুয়েটে জায়গা করে নেন ছোট ভাই হাসান মামুন। ফলে বড় ভাইয়ের বুয়েটযাত্রার প্রায় এক যুগ পরও পরিবারটির সঙ্গে বুয়েটের সম্পর্ক অব্যাহত থাকে।
চার ভাইয়ের বেড়ে ওঠাও ছিল একই পরিবেশে। তাঁদের বাবা আমিনুর রহমান একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা আলেয়া বেগম গৃহিণী। বাড়ির পাশের ছাইনীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয় ভাইবোনের শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে চার ভাই একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা চুয়েট স্কুল ও কলেজ থেকে পড়াশোনা করেন।
শৈশবে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও ছিল তাঁদের আগ্রহ। চার ভাইয়ের ক্রিকেটের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল। তবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাবা মায়ের নজর ছিল কড়া। ছোটবেলায় মা ও বাবা নিজেরাই সন্তানদের পড়াশোনায় সময় দিয়েছেন। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মা এবং সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাবা তাঁদের পড়িয়েছেন। এরপর বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে বড় ভাইয়েরাই ছোটদের সহযোগিতা করেছেন।
মজার বিষয় হলো, পরিবারের পক্ষ থেকে চার ভাইকে বুয়েটে পড়তেই হবে এমন কোনো চাপ ছিল না। বরং বাবা মা চেয়েছিলেন সন্তানরা চিকিৎসক হোক। বড় বোন আয়েশা সুলতানা চিকিৎসক হয়েছেন। কিন্তু চার ভাইয়ের শিক্ষাজীবন শেষ পর্যন্ত প্রকৌশলের দিকেই এগিয়েছে। চুয়েট ক্যাম্পাসের স্কুল কলেজে পড়ার কারণেও প্রকৌশলের প্রতি তাঁদের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল বলে হাসান মামুন তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন।
চার ভাইয়ের সাফল্যের পেছনে আলাদা কোনো বিশেষ কৌশলের কথা তাঁরা বলেননি। তাঁদের মতে, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার মৌলিক বিষয়গুলো ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে গণিতের ওপর বাবা গুরুত্ব দিয়েছেন। বড় ভাই বুয়েটে যাওয়ার পর ছোটদের জন্য আরও একটি সুবিধা তৈরি হয়। বুয়েটের অভিজ্ঞতা, ভর্তি প্রস্তুতি ও বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে বড় ভাইয়েরা তাঁদের সহযোগিতা করেছেন। করোনার সময় বড় ভাইয়েরা বাড়িতে থাকায় ছোটদের পড়াশোনায় সেই সহযোগিতা আরও বেশি ছিল।
তবে ছোট ভাই হাসান মামুনের ক্ষেত্রে চাপটা ছিল একটু আলাদা। তাঁর আগের তিন ভাইই বুয়েটে পড়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সবার প্রত্যাশা ছিল, তিনিও বুয়েটে ভর্তি হবেন। ভর্তি পরীক্ষার আগে তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল, ভাইদের মতো তিনিও কি বুয়েটে সুযোগ পাবেন। শেষ পর্যন্ত ৩২৪তম হয়ে সেই সুযোগ পান তিনি।
চার ভাইয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলও যেন পরিবারের গল্পটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বড় ভাই হাসান মনির ৫৭তম, মেজো ভাই হাসান মুরাদ ৭৪তম, সেজো ভাই হাসান মাসুম ৮০তম এবং ছোট ভাই হাসান মামুন ৩২৪তম হন। অর্থাৎ চার ভাইই বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।
চার ভাইয়ের শিক্ষাজীবনও এখন ভিন্ন ভিন্ন পথে এগিয়েছে। বড় ভাই হাসান মনির বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে ঢাকার মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন এবং বুয়েটে স্নাতকোত্তরও করেছেন। হাসান মুরাদ চুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কাজ করেছেন এবং বুয়েটে স্নাতকোত্তর করেছেন। হাসান মাসুম বুয়েটে পড়েছেন। ছোট ভাই হাসান মামুন ২০২১ থেকে ২০২২ শিক্ষাবর্ষে বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন।
চার ভাইয়ের পাশাপাশি তাঁদের বড় বোন আয়েশা সুলতানাও চিকিৎসক হয়েছেন। অর্থাৎ একই পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার পথ ছিল বৈচিত্র্যময়। চার ভাই প্রকৌশলের পথে এগিয়েছেন, আর বড় বোন বেছে নিয়েছেন চিকিৎসাবিদ্যা।
বাবা মা নিজেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ না পেলেও সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। একজনের পর একজন ভাই যখন বুয়েটে ভর্তি হয়েছেন, তখন বড় ভাইয়ের অভিজ্ঞতা ছোটদের পথ দেখিয়েছে। আবার ছোটদের সাফল্য আগের ভাইদের পথচলাকেও আরও অর্থবহ করেছে।
এক ভাইয়ের বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর আরেক ভাইয়ের সামনে খুলে গেছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। এভাবেই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার একটি পরিবারের চার ভাইয়ের শিক্ষাজীবন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। ২০০৯ সালে বড় ভাই হাসান মনিরের বুয়েটে ভর্তি দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, পরে তাতে যুক্ত হয়েছেন আরও তিন ভাই। একটি পরিবারের চার ভাইয়ের এই বুয়েটযাত্রা তাই শুধু একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার গল্প নয়, বরং একে অন্যের পথ দেখিয়ে এগিয়ে যাওয়ারও গল্প।


























