কুমারুলী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে শ্লীলতাহানির মামলায় গ্রেপ্তার সহকারী শিক্ষক মো. খালেকুজ্জামান জামান সুজনের মুক্তির দাবিতে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ করেছে। একপর্যায়ে তারা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. চাঁন মিয়াসহ কয়েকজন শিক্ষককে কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখে। এতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে উপজেলার কুমারুলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে বিদ্যালয়ের মাঠে অবস্থান নেয়। পরে তারা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও অফিস কক্ষের প্রবেশগেটে তালা লাগিয়ে কয়েকজন শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে। দুপুর ৩টা পর্যন্ত এ পরিস্থিতি চলছিল।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষক সুজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা ‘মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক’। তারা শিক্ষক সুজনকে ভালো মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি এমন কাজ করতে পারেন না এবং পরিকল্পিতভাবে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। অবিলম্বে তাঁর মুক্তি না দিলে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় তারা।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিম ইকবাল, আবু রায়হান, নবম শ্রেণির মিসকাতুল, লামিয়া, শুভ মিয়া এবং অষ্টম শ্রেণির সিদনাত সুলতানা জীমসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘সুজন স্যার খুব ভালো মনের মানুষ। তিনি এমন কাজ করতে পারেন না। স্যারকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে।’
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমারুলী বাজারসংলগ্ন একটি প্রাইভেট পড়ানোর কক্ষে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে শিক্ষক সুজনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষার্থীর পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বিদ্যালয়ে গিয়ে বিচার দাবি করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. চাঁন মিয়া বাদী হয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় পুলিশ শিক্ষক সুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষক সুজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে এলাকাবাসী ও অভিভাবকেরা বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে শ্রেণিকক্ষ ও অফিসকক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক চাঁন মিয়া বলেন, শিক্ষার্থীর পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি অভিযোগ নিয়ে আসার পর অফিস সহকারীকে দিয়ে বিষয়টি যাচাই করা হয়। প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা সুজন স্যারের বিপক্ষে নই। সুষ্ঠু তদন্তে যা হবে, আমরা তা মেনে নেব।’
বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ওই শিক্ষার্থীর বাড়িতে যান। সেখানে শিক্ষার্থী ঘটনার কথা তাঁর কাছে স্বীকার করেছে বলে দাবি করেন তিনি। এ বক্তব্যের একটি অডিও রেকর্ডও রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক সুজন। গ্রেপ্তারের আগে তিনি অভিযোগটিকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’ দাবি করে বলেন, একটি কুচক্রী মহল এবং স্কুলের শিক্ষক-স্টাফদের একটি চক্র তাঁর বিরুদ্ধে এসব করছে।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই শিক্ষার্থীর বাবা মো. আব্দুর রউফও। পার্শ্ববর্তী নান্দাইল থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তাঁর মেয়ে প্রায় ১৫ দিন ধরে অসুস্থ থাকায় স্কুল বা প্রাইভেটে যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওটিও তাঁর মেয়ের নয় এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁর মেয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে তিনি দাবি করেন।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ওসি মো. সাজ্জাদ রোমন বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্তকাজ চলমান রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যদের পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি জরুরি
একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, সেই অভিযোগ অস্বীকার, ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করা শিক্ষার্থীর পরিবারের ভিন্ন বক্তব্য এবং এরই মধ্যে মামলা ও গ্রেপ্তার—ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু তদন্ত এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগটি সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে তদন্তে যদি অভিযোগটি মিথ্যা, ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হয়, তাহলে মিথ্যা অভিযোগ, অপবাদ বা কাউকে হয়রানির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাত নয়—প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ এমন ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর ক্লাস বর্জন, বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবরুদ্ধ করার ঘটনায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক আস্থা এবং বিদ্যালয়ের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একটি বিদ্যালয় কোনো পক্ষের সংঘাতের ক্ষেত্র হতে পারে না। এটি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে জ্ঞান অর্জন, নৈতিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ গঠনের জায়গা। কোনো অভিযোগ উঠলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন বা শিক্ষক অবরুদ্ধ করার পরিবর্তে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা এবং অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা বা ধামাচাপা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
তাই কুমারুলী উচ্চ বিদ্যালয়ের এ ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা ও শাস্তি নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে নির্দোষ কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই ঘটনার কারণে যেন আর একটি দিনও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম অযথা ব্যাহত না হয়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনাই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সব পক্ষের প্রধান দায়িত্ব।

























