দুশ্চিন্তা সামলান নিজের মতো, বুটেক্সে নেই কাউন্সেলিং সেবা
রাত বাড়ছে। টেবিলে খোলা বই-খাতা, সামনে সেমিস্টার ফাইনাল। শেষ হয়নি ল্যাব রিপোর্টও। পরীক্ষায় ভালো ফল হবে তো? ডিগ্রি শেষে পছন্দের চাকরি মিলবে কি? পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন দুশ্চিন্তায় থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী। এর সঙ্গে কখনো যুক্ত হয় পারিবারিক অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের সংকট। কিন্তু মনের কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া বা প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার সুযোগ সব সময় থাকে না।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) বিভিন্ন ব্যাচের নয়জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মানসিক চাপের কারণ ও তা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা জানা গেছে। তাঁদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে পরীক্ষার চাপ, কর্মজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত সংকটের কথা। একই সঙ্গে তাঁরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং সেবার প্রয়োজনীয়তার কথাও।
পরীক্ষার আগে দুশ্চিন্তায় কাটে রাত
ক্লাস টেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, ল্যাবের কাজ ও সেমিস্টার ফাইনাল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। নির্ধারিত সময়ে ল্যাব রিপোর্ট জমা দেওয়া ও পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপ কখনো ঘুমের ওপরও প্রভাব ফেলে।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাকিব আল হাসান বলেন, পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাসকিয়া আহমেদেরও পরীক্ষার আগের রাতে পড়া মনে থাকবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়। কখনো সেই উদ্বেগে ঘুম আসে না।
ফ্যাব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নাজরানা মেহরাজ দিবা জানান, পরীক্ষার সময় কখনো কখনো তাঁর ঘুম তিন থেকে চার ঘণ্টায় নেমে আসে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মারজিয়া বিনতে হাসানের কাছে ল্যাবের কাজ ও সময়মতো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চাপ বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
ডিগ্রির পর কী, সেই অনিশ্চয়তা
পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ নিয়েও ভাবনা রয়েছে শিক্ষার্থীদের। ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজুর রহমানের প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান বাস্তব কারখানার কাজে কতটা কার্যকর হবে। শেষ সেমিস্টারে থাকা নাজরানা মেহরাজ দিবাও ভাবছেন, ভবিষ্যতে নিজের জন্য উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র বেছে নেওয়া নিয়ে।
সাকিব আল হাসানের উদ্বেগ বস্ত্রশিল্পে চাকরির সুযোগ ও বেতন নিয়ে। অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী উম্মে খাদিজাতুল জান্নাতি মনে করেন, সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে জানা এবং পেশা বেছে নেওয়া সহজ হতো।
ব্যক্তিগত সংকটও বাড়ায় চাপ
পড়াশোনার বাইরের ঘটনাও শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলে। শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষার সময় নাজরানা মেহরাজ দিবাকে অসুস্থ বাবার অস্ত্রোপচার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়েছে। বাবার পাশে থাকতে না পারার কষ্টের পাশাপাশি তাঁকে সামলাতে হয়েছে পরীক্ষার প্রস্তুতিও।
ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. আসিফুজ্জামান সিয়ামের পরিবারের একজন সদস্যের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর পরিবারের পাশে থাকার দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে পারিবারিক উদ্বেগের সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়।
মনের কথা বলার জায়গা কোথায়
মানসিক চাপের সময় কারও সঙ্গে কথা বলতে পারা স্বস্তির কারণ হতে পারে। তবে সবাই সহজে নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করতে পারেন না। কেউ বন্ধু বা পরিবারের সহায়তা নেন, আবার কেউ অন্যের প্রতিক্রিয়া নিয়ে শঙ্কায় চুপ থাকেন।
উম্মে খাদিজাতুল জান্নাতির মতে, সব সমস্যার সমাধান দেওয়া সম্ভব না হলেও বিচার না করে মন দিয়ে কথা শোনার মতো একজন মানুষ পাশে থাকা জরুরি। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আসিফ জামান কঠিন সময়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ইমতিয়াজুর রহমানও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মা-বাবার কাছ থেকে সহায়তা পান।
বুটেক্সে নেই পৃথক কাউন্সেলিং সেবা
শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতায় মানসিক চাপ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি পেশাদার পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। তবে বুটেক্সে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে কাউন্সেলিং সেবা দেওয়ার জন্য পৃথক কোনো উদ্যোগ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।
তাসকিয়া আহমেদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সাকিব আল হাসান মনে করেন, কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি সেমিস্টারের সময়সূচিও বাস্তবসম্মত হওয়া জরুরি। ছয় মাসের সেমিস্টার তিন মাসে শেষ করার চেষ্টা কিংবা নির্ধারিত সময়ের আগেই পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্যাণ পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, কাউন্সেলিং সেবা চালুর প্রস্তাব এলে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বাইরে থেকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এনে মাসিক বা তিন থেকে ছয় মাস অন্তর সেবা দেওয়ার বিষয়টি ভাবা সম্ভব। এ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সেলও (আইকিউএসি) ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষার্থীদের কথায়, পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ ও ব্যক্তিগত সংকটের চাপ সামলে এগিয়ে যেতে মানসিক সহায়তার নিরাপদ পরিবেশ ও পেশাদার কাউন্সেলিং জরুরি। তাঁদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

























