পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো আলাদা রাষ্ট্র নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের
পাহাড় ও ঝরনার রূপময় সৌন্দর্যের রূপসী পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভূখণ্ডের এক অনন্য এবং অনবদ্য অংশ। তবে সাম্প্রতিক নানা আলোচনা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তিকর প্রচার এবং কতিপয় অপশক্তির হীন চক্রান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন—পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; এটি শতভাগ স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ভূখণ্ড। আর এই ভূখণ্ডের প্রতি ইঞ্চি মাটির ওপর অধিকার দেশের ১৭ কোটি নাগরিকের, এটি নির্দিষ্ট কোনো একক বা গুটি কয়েক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য এককভাবে বরাদ্দকৃত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল নয়।
১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্ত ও অগণিত মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে বাংলাদেশ অর্জন করেছি, তার সার্বভৌমত্ব ভৌগোলিক কিংবা জাতিগতভাবে বিভক্ত নয়। সংবিধানের মূল চেতনায় পরিষ্কার বলা হয়েছে—বাংলাদেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। পার্বত্য অঞ্চলে শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, পাংখোয়া কিংবা তঞ্চঙ্গ্যাসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী যেমন এই দেশের সম্মানিত নাগরিক, ঠিক একইভাবে সমতল থেকে যাওয়া বা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাঙালিরাও সমান মর্যাদার অধিকারী। পাহাড়কে সমতলের অধিবাসীদের জন্য নিষিদ্ধ কিংবা কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি জাতির ‘একচ্ছত্র চারণভূমি’ মনে করার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেশের সংবিধানে নেই।
অতীতে দেখা গেছে, পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক সংবেদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠী পাহাড়ে অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রাখার চক্রান্ত করেছে। নিজস্ব সশস্ত্র দল গঠন, পাহাড়ি-বাঙালি বিভেদ তৈরি, চাঁদাবাজি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী উস্কানি দিয়ে পাহাড়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে অতীষ্ঠ করে তোলা হয়েছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী দীর্ঘকাল ধরে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে আসছে। নিরাপত্তা বাহিনীর নিরলস প্রচেষ্টায় সেখানে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রয়েছে। অথচ একটি মহল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা ভূখণ্ড হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালায়—যা বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের সরাসরি বিরোধী।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের জল, হাওয়া ও মাটি যেমন পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর, তেমনই একজন সাধারণ বাঙালি নাগরিকেরও। পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পর্যটন শিল্প এবং অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পাহাড়কে মূলধারার দেশের সাথে সম্পূর্ণ সমন্বিত করতে হবে। দেশের যেকোনো নাগরিকের সেখানে বসবাস করা, জমি কেনা, ব্যবসা পরিচালনা করা এবং অবাধ বিচরণের অধিকার সাংবিধানিক। ‘পাহাড় শুধু পাহাড়িদের’—এই ধরনের চরমপন্থী মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর জন্যই অকল্যাণ বয়ে আনে।
বাংলাদেশের মানচিত্র আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রতীক। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, কিংবা রূপসী জাফলং থেকে পার্বত্য সাজেক—পুরো বাংলা এক ও অভিন্ন। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যেকোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা, আলাদা রাষ্ট্রের মিথ্যা দাবি কিংবা একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর একচ্ছত্র অধিকারের অপচেষ্টাকে দেশপ্রেমিক জনগণ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। পাহাড় ও সমতলের সকল নাগরিকের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সমান অধিকার ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
লেখক: মোঃ সাদিকুল ইসলাম
সংগঠক, সংবাদকর্মী ও কলামিস্ট


























