1. admin@kagojerbarta.com : admin :
  2. amirsadeky88@gmail.com : amirsadeky :
  3. faysalajony@gmail.com : FAYSAL AHMED :
  4. kamrul304076@gmail.com : Kamrul :
  5. jamalpurbakshiganj@gmail.com : Kamrulbk :
  6. mdsaimkhanbd7@gmail.com : mdsaimkhan123 :
  7. motin.imran07051986@gmail.com : motin.imran07051986@gmail.com :
  8. seyam2858@gmail.com : seyam :
ঢাকা ০৮:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টন কিংবদন্তি আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ: স্মৃতিপটে এক অচেনা নায়ক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আবেদন

স্পোর্টস ডেস্ক:
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
৪

​বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টন ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যে মানুষটির নাম সবার আগে স্বর্ণাক্ষরে ভেসে ওঠে, তিনি আর কেউ নন—আমাদের সকলের প্রিয় আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ (পরিবারের স্নেহের নাম ‘টুকু মিয়া’)। ১৯২৪ সালে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার সাউথমারা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন ইংরেজি শিক্ষক ও বিশিষ্ট সাহিত্যপ্রেমী আব্দুল ওয়াহাব—যিনি ১৯৪০-এর দশকে বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ-এর সাথে চিঠিপত্রে যোগাযোগ রেখেছিলেন এবং শ-এর নিকট থেকে চিঠিও লাভ করেছিলেন।
​বিদ্বান পিতার সন্তান হলেও ছোটবেলা থেকেই ব্যাডমিন্টনের প্রতি তাঁর একটা ঝোঁক ছিল এবং খেলাধুলার প্রতিই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। কিন্তু কৈশোরেই পরিবারে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার; জ্যেষ্ঠ ভাইয়ের অকালমৃত্যু ও পিতার অসুস্থতায় অল্প বয়সেই পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। সংসারের হাল ধরতে ঢাকায় এসে খাদ্য বিভাগে সাব-ইনস্পেক্টরের চাকরি শুরু করেন এবং একইসাথে ঢাকা কলেজের সান্ধ্য বিভাগে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান।
​খেলোয়াড় থেকে “আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ”
​পাকিস্তান আমল থেকেই ব্যাডমিন্টনে নিজের দক্ষতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ। খেলার প্রতি চরম নিষ্ঠা ও নতুন খেলোয়াড় তৈরির অসাধারণ ক্ষমতার কারণে মানুষ ভালোবেসে তাঁকে “ওস্তাদ” উপাধিতে ভূষিত করে, আর তিনি পরিচিতি পান “আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ” নামে। প্রখ্যাত ক্রীড়াবিদ এম. এইচ. খান (লাটু মিয়া) ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও খেলার মাঠের সহযোদ্ধা। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এই দুজনের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ঢাকা ব্যাডমিন্টন ক্লাব’। আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ শুধু ঢাকা ব্যাডমিন্টন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই ক্লাবের একাধারে একজন দক্ষ খেলোয়াড় এবং দূরদর্শী সংগঠক। একই বছর দেশের প্রথম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি দ্বৈত বিভাগে রানার-আপ এবং তাঁর পুত্র জাকারিউল ইসলাম স্বপন জুনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৭৯ সালে তিনি প্রবীণ দ্বৈত বিভাগে এবং তাঁর পুত্র পুরুষ দ্বৈত বিভাগে একই সাথে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল রেকর্ড গড়েছিলেন, যা তৎকালীন জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিশেষ শিরোনাম হয়েছিল।
​অগণিত তারকা গড়ার কারিগর ও বিশাল হৃদয়ের মানুষ
​আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ শুধু খেলাই শেখাতেন না, তিনি ছিলেন একজন রত্ন চেনার মতো জহুরি। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি ব্যাডমিন্টন তারকা মাহবুবের প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন—যিনি পরবর্তীতে টানা ১০ বছর বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টনে শীর্ষস্থান ধরে রাখেন। এছাড়া সাইফুল ইসলাম পিন্টু, ফেরদৌসী এবং তাঁর নিজের সুযোগ্য সন্তান স্থপতি স্বপন ভাই সহ দেশের অসংখ্য নামীদামী খেলোয়াড় তৈরি হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই।
​মাঠের খেলোয়াড় গড়ার পাশাপাশি মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। ব্যাডমিন্টন পাড়াসহ যেকোনো এলাকায় তিনি যেখানেই যেতেন, ব্যাডমিন্টনের সাথে সম্পৃক্ত সর্বস্তরের মানুষ—খেলোয়াড়, সংগঠক ও কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবাই তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে দেখতেন এবং সমীহ করে চলতেন। সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকা এই মানুষটি ব্যাডমিন্টনকে মনে-প্রাণে ভালোবাসতেন। হাজারীবাগে সুযোগ পেলেই তিনি তাঁর প্রিয় ভেসপা চালিয়ে চলে আসতেন, র‍্যাকেট হাতে নিয়ে পেছনে রেখে এসে বসতেন। সেখানে বসে আড্ডা দিতেন, সবাইকে হাসাতেন। ছোট বা বড়—কাউকে পেলেই নিজ খরচে ডালপুরি-পুরি কিনে খাওয়াতেন। কারো সাথে দেখা করতে এলে কিছু না কিছু নিয়ে আসা ছিল তাঁর চিরচেনা স্বভাব।
​আমার ব্যক্তিজীবনের খেলাধুলার শুভসূচনা ও সংগঠক হিসেবে পথচলা
​ব্যক্তিগতভাবে খেলাধুলার প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ, পিন্টু ভাই, ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের তৎকালীন সেক্রেটারি মবিন ভাই এবং প্রখ্যাত ব্যাডমিন্টন রেফারি ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব মশেদুজ্জামান (জামান) ভাইয়ের অনুপ্রেরণাতেই আমার খেলাধুলার জগৎ শুরু হয়। তাঁদের দিকনির্দেশনা ও সুবাদেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে চায়না থেকে আসা কোচ ‘রংসু’-র অধীনে বিশেষ ট্রেনিংয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই। সেই ট্রেনিং শেষে চাইনিজ কোচ আমার সার্টিফিকেটে বিশেষ প্রশংসাসূচক মন্তব্যও করেছিলেন। পরবর্তীতে নরসিংদীর জুট মিল কর্মকর্তার ছেলে মহিউদ্দিনকে সাথে নিয়ে জুনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বৈত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি, যা আজও আমার স্মৃতির পাতায় অমলিন। এরপর আমি ফার্স্ট ডিভিশন ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় অংশ নেই এবং দিলকুশা, ওয়ান্ডারার্স ও ঢাকা ব্যাডমিন্টন ক্লাবের হয়ে নিয়মিতভাবে খেলেছি।
​একটি কথা না বললেই নয়, একসময় আমি নিজেও দুই-তিন মেয়াদের মতো ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের মেম্বার ছিলাম। বিশেষ করে মবিন ভাই যখন সেক্রেটারি ছিলেন, তখন টুর্নামেন্ট কমিটির সম্পাদক হিসেবে মিরপুর স্টেডিয়ামে আয়োজিত অত্যন্ত বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ দুটি জাতীয় টুর্নামেন্ট অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে সরাসরি পরিচালনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। ব্যাডমিন্টন অঙ্গনের সেই আনন্দময় স্মৃতিগুলো আজও আমার মনে গভীরভাবে ভেসে ওঠে।
​আত্মার সম্পর্ক ও অন্তরের অন্তস্তল থেকে সম্মান
​আমিনুল ইসলাম ওস্তাদের সাথে আমাদের সম্পর্কটি শুধু খেলাধুলার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর সাথে ছিল আমাদের এক গভীর ও নিবিড় আত্মার সম্পর্ক। তাই আজও তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর সম্মান ও ভালোবাসা জানিয়ে আমরা নিয়মিত “আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ স্মৃতি ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা”-র আয়োজন করে আসছি। শুধু খেলাধুলাই নয়, আমাদের সামাজিক কর্মকাণ্ডগুলোতেও তিনি অমলিন—পুরানঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকাবাসী’ সংগঠনের বর্ণাঢ্য ঈদ মিছিল ও সামাজিক আয়োজনগুলো তাঁর নামে উৎসর্গ করা হয়। এমনকি তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর নামে একটি পাঠাগারও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব কাজ কোনো বাহ্যিক নিয়মের খাতিরে নয়, বরং একেবারেই অন্তরের অন্তস্তল ও ভালোবাসা থেকে করা, কারণ তিনি আমাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গ্রহণ করে আছেন।
​সন্তানদের সুপ্রতিষ্ঠিত করে রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার
​তিনি বিশ্বাস করতেন, খেলাধুলা একজন মানুষের চরিত্র, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব গড়ে তোলে। তিনি তাঁর সন্তানদের নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র জাকারিউল ইসলাম স্বপন একজন স্বনামধন্য স্থপতি ও ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন। কন্যা তাহমিনা বেগম (লাভলী) ও সাবিকুন্নাহার (তাজী) সামাজিক ও মানবকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত। কন্যা জেসমিন সুলতানা (বিউটি) যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে শিক্ষকতায় নিয়োজিত এবং কন্যা শিউলি খান ছিলেন দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব (যাকে ১৯৮৮ সালে অকালে হারাতে হয়)।
​চিরদিনের শ্রদ্ধা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আকুল আবেদন
​২০০৬ সালের জুন মাসে এই মহান ক্রীড়াগুরু আমাদের ছেড়ে চলে যান। তৎকালীন সময়ে যখন দেশে কোনো ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন তৈরিই হয়নি, তখন যিনি একক প্রচেষ্টায় দেশে এই খেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্য—জীবদ্দশায় তিনি প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি পাননি।
​সহজ, সরল, বন্ধুসুলভ ও পরম প্রিয় এই ব্যাডমিন্টন কিংবদন্তি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতিগুলো প্রতিদিন আমাদের চোখে-মুখে ভেসে ওঠে। হাজারীবাগের মানুষসহ পুরো দেশের ক্রীড়াঙ্গন তাঁকে চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
​একজন নিঃস্বার্থ খেলোয়াড় ও সফল সংগঠক হিসেবে আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ সারাজীবন দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে দিয়ে গেছেন, বিনিময়ে কিছুই চাননি। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে তাঁর এই ঋণ শোধ করার দায়িত্ব আমাদেরও রয়েছে। তিনি যেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্ৰণালয়ের বিশেষ সম্মানে (মরণোত্তর) ভূষিত হন—এ ব্যাপারে আমি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্ৰণালয়ের সম্মানিত মন্ত্রীর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ ও আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

​স্মৃতিকথায়:
মোহাম্মদ শুকুর সালেক
সাবেক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ০২:২৩:৫৬ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টন কিংবদন্তি আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ: স্মৃতিপটে এক অচেনা নায়ক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আবেদন

আপডেট সময় : ০২:২৩:৫৬ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
৪

​বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টন ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যে মানুষটির নাম সবার আগে স্বর্ণাক্ষরে ভেসে ওঠে, তিনি আর কেউ নন—আমাদের সকলের প্রিয় আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ (পরিবারের স্নেহের নাম ‘টুকু মিয়া’)। ১৯২৪ সালে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার সাউথমারা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন ইংরেজি শিক্ষক ও বিশিষ্ট সাহিত্যপ্রেমী আব্দুল ওয়াহাব—যিনি ১৯৪০-এর দশকে বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ-এর সাথে চিঠিপত্রে যোগাযোগ রেখেছিলেন এবং শ-এর নিকট থেকে চিঠিও লাভ করেছিলেন।
​বিদ্বান পিতার সন্তান হলেও ছোটবেলা থেকেই ব্যাডমিন্টনের প্রতি তাঁর একটা ঝোঁক ছিল এবং খেলাধুলার প্রতিই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। কিন্তু কৈশোরেই পরিবারে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার; জ্যেষ্ঠ ভাইয়ের অকালমৃত্যু ও পিতার অসুস্থতায় অল্প বয়সেই পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। সংসারের হাল ধরতে ঢাকায় এসে খাদ্য বিভাগে সাব-ইনস্পেক্টরের চাকরি শুরু করেন এবং একইসাথে ঢাকা কলেজের সান্ধ্য বিভাগে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান।
​খেলোয়াড় থেকে “আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ”
​পাকিস্তান আমল থেকেই ব্যাডমিন্টনে নিজের দক্ষতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ। খেলার প্রতি চরম নিষ্ঠা ও নতুন খেলোয়াড় তৈরির অসাধারণ ক্ষমতার কারণে মানুষ ভালোবেসে তাঁকে “ওস্তাদ” উপাধিতে ভূষিত করে, আর তিনি পরিচিতি পান “আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ” নামে। প্রখ্যাত ক্রীড়াবিদ এম. এইচ. খান (লাটু মিয়া) ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও খেলার মাঠের সহযোদ্ধা। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এই দুজনের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ঢাকা ব্যাডমিন্টন ক্লাব’। আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ শুধু ঢাকা ব্যাডমিন্টন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই ক্লাবের একাধারে একজন দক্ষ খেলোয়াড় এবং দূরদর্শী সংগঠক। একই বছর দেশের প্রথম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি দ্বৈত বিভাগে রানার-আপ এবং তাঁর পুত্র জাকারিউল ইসলাম স্বপন জুনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৭৯ সালে তিনি প্রবীণ দ্বৈত বিভাগে এবং তাঁর পুত্র পুরুষ দ্বৈত বিভাগে একই সাথে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল রেকর্ড গড়েছিলেন, যা তৎকালীন জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিশেষ শিরোনাম হয়েছিল।
​অগণিত তারকা গড়ার কারিগর ও বিশাল হৃদয়ের মানুষ
​আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ শুধু খেলাই শেখাতেন না, তিনি ছিলেন একজন রত্ন চেনার মতো জহুরি। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি ব্যাডমিন্টন তারকা মাহবুবের প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন—যিনি পরবর্তীতে টানা ১০ বছর বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টনে শীর্ষস্থান ধরে রাখেন। এছাড়া সাইফুল ইসলাম পিন্টু, ফেরদৌসী এবং তাঁর নিজের সুযোগ্য সন্তান স্থপতি স্বপন ভাই সহ দেশের অসংখ্য নামীদামী খেলোয়াড় তৈরি হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই।
​মাঠের খেলোয়াড় গড়ার পাশাপাশি মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। ব্যাডমিন্টন পাড়াসহ যেকোনো এলাকায় তিনি যেখানেই যেতেন, ব্যাডমিন্টনের সাথে সম্পৃক্ত সর্বস্তরের মানুষ—খেলোয়াড়, সংগঠক ও কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবাই তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে দেখতেন এবং সমীহ করে চলতেন। সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকা এই মানুষটি ব্যাডমিন্টনকে মনে-প্রাণে ভালোবাসতেন। হাজারীবাগে সুযোগ পেলেই তিনি তাঁর প্রিয় ভেসপা চালিয়ে চলে আসতেন, র‍্যাকেট হাতে নিয়ে পেছনে রেখে এসে বসতেন। সেখানে বসে আড্ডা দিতেন, সবাইকে হাসাতেন। ছোট বা বড়—কাউকে পেলেই নিজ খরচে ডালপুরি-পুরি কিনে খাওয়াতেন। কারো সাথে দেখা করতে এলে কিছু না কিছু নিয়ে আসা ছিল তাঁর চিরচেনা স্বভাব।
​আমার ব্যক্তিজীবনের খেলাধুলার শুভসূচনা ও সংগঠক হিসেবে পথচলা
​ব্যক্তিগতভাবে খেলাধুলার প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ, পিন্টু ভাই, ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের তৎকালীন সেক্রেটারি মবিন ভাই এবং প্রখ্যাত ব্যাডমিন্টন রেফারি ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব মশেদুজ্জামান (জামান) ভাইয়ের অনুপ্রেরণাতেই আমার খেলাধুলার জগৎ শুরু হয়। তাঁদের দিকনির্দেশনা ও সুবাদেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে চায়না থেকে আসা কোচ ‘রংসু’-র অধীনে বিশেষ ট্রেনিংয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই। সেই ট্রেনিং শেষে চাইনিজ কোচ আমার সার্টিফিকেটে বিশেষ প্রশংসাসূচক মন্তব্যও করেছিলেন। পরবর্তীতে নরসিংদীর জুট মিল কর্মকর্তার ছেলে মহিউদ্দিনকে সাথে নিয়ে জুনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বৈত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি, যা আজও আমার স্মৃতির পাতায় অমলিন। এরপর আমি ফার্স্ট ডিভিশন ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় অংশ নেই এবং দিলকুশা, ওয়ান্ডারার্স ও ঢাকা ব্যাডমিন্টন ক্লাবের হয়ে নিয়মিতভাবে খেলেছি।
​একটি কথা না বললেই নয়, একসময় আমি নিজেও দুই-তিন মেয়াদের মতো ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের মেম্বার ছিলাম। বিশেষ করে মবিন ভাই যখন সেক্রেটারি ছিলেন, তখন টুর্নামেন্ট কমিটির সম্পাদক হিসেবে মিরপুর স্টেডিয়ামে আয়োজিত অত্যন্ত বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ দুটি জাতীয় টুর্নামেন্ট অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে সরাসরি পরিচালনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। ব্যাডমিন্টন অঙ্গনের সেই আনন্দময় স্মৃতিগুলো আজও আমার মনে গভীরভাবে ভেসে ওঠে।
​আত্মার সম্পর্ক ও অন্তরের অন্তস্তল থেকে সম্মান
​আমিনুল ইসলাম ওস্তাদের সাথে আমাদের সম্পর্কটি শুধু খেলাধুলার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর সাথে ছিল আমাদের এক গভীর ও নিবিড় আত্মার সম্পর্ক। তাই আজও তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর সম্মান ও ভালোবাসা জানিয়ে আমরা নিয়মিত “আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ স্মৃতি ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা”-র আয়োজন করে আসছি। শুধু খেলাধুলাই নয়, আমাদের সামাজিক কর্মকাণ্ডগুলোতেও তিনি অমলিন—পুরানঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকাবাসী’ সংগঠনের বর্ণাঢ্য ঈদ মিছিল ও সামাজিক আয়োজনগুলো তাঁর নামে উৎসর্গ করা হয়। এমনকি তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর নামে একটি পাঠাগারও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব কাজ কোনো বাহ্যিক নিয়মের খাতিরে নয়, বরং একেবারেই অন্তরের অন্তস্তল ও ভালোবাসা থেকে করা, কারণ তিনি আমাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গ্রহণ করে আছেন।
​সন্তানদের সুপ্রতিষ্ঠিত করে রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার
​তিনি বিশ্বাস করতেন, খেলাধুলা একজন মানুষের চরিত্র, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব গড়ে তোলে। তিনি তাঁর সন্তানদের নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র জাকারিউল ইসলাম স্বপন একজন স্বনামধন্য স্থপতি ও ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন। কন্যা তাহমিনা বেগম (লাভলী) ও সাবিকুন্নাহার (তাজী) সামাজিক ও মানবকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত। কন্যা জেসমিন সুলতানা (বিউটি) যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে শিক্ষকতায় নিয়োজিত এবং কন্যা শিউলি খান ছিলেন দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব (যাকে ১৯৮৮ সালে অকালে হারাতে হয়)।
​চিরদিনের শ্রদ্ধা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আকুল আবেদন
​২০০৬ সালের জুন মাসে এই মহান ক্রীড়াগুরু আমাদের ছেড়ে চলে যান। তৎকালীন সময়ে যখন দেশে কোনো ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন তৈরিই হয়নি, তখন যিনি একক প্রচেষ্টায় দেশে এই খেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্য—জীবদ্দশায় তিনি প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি পাননি।
​সহজ, সরল, বন্ধুসুলভ ও পরম প্রিয় এই ব্যাডমিন্টন কিংবদন্তি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতিগুলো প্রতিদিন আমাদের চোখে-মুখে ভেসে ওঠে। হাজারীবাগের মানুষসহ পুরো দেশের ক্রীড়াঙ্গন তাঁকে চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
​একজন নিঃস্বার্থ খেলোয়াড় ও সফল সংগঠক হিসেবে আমিনুল ইসলাম ওস্তাদ সারাজীবন দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে দিয়ে গেছেন, বিনিময়ে কিছুই চাননি। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে তাঁর এই ঋণ শোধ করার দায়িত্ব আমাদেরও রয়েছে। তিনি যেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্ৰণালয়ের বিশেষ সম্মানে (মরণোত্তর) ভূষিত হন—এ ব্যাপারে আমি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্ৰণালয়ের সম্মানিত মন্ত্রীর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ ও আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

​স্মৃতিকথায়:
মোহাম্মদ শুকুর সালেক
সাবেক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়