যানজট নিরসনে ঢাকার ৯৮ বাস রুট কমে হচ্ছে ৩২, আজ ৬ রুটের উদ্বোধন
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুট কমিয়ে ৩২টি সমন্বিত রুটে আনা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি রুটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হচ্ছে আজ রবিবার (১ নভেম্বর)। পর্যায়ক্রমে বাকি রুটগুলোও নতুন ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় একই সড়কে একাধিক পরিবহন কোম্পানির বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমবে। পাশাপাশি নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা, বাস চলাচলে শৃঙ্খলা, যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি নির্ধারিত রুটে একটি কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র বাস থামানো এবং একই পথে অতিরিক্ত বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতেই বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা ও যানবাহন চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে ৯৮টি রুটকে ৩২টি সমন্বিত রুটে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ডিটিসিএ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ২০১১ সালে। সে সময় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ডের (ডিটিসিবি) মাধ্যমে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পরে ২০১৯ সালে ডিটিসিএ নতুন করে পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ৪২টি রুটের প্রস্তাব করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে ৩২টি রুট চূড়ান্ত করা হয়।
পরিকল্পনা তৈরিতে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। সচল ৯৮টি বাস রুটের প্রতিটিতে ১৮টি ট্রিপের যাত্রী ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি ৩৫ হাজারের বেশি বাসযাত্রীর যাত্রা শুরুর স্থান ও গন্তব্য নিয়ে জরিপ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগরীর ৭২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়। প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের অবকাঠামোগত অবস্থা পর্যালোচনায় ড্রোনের মাধ্যমে ছবি সংগ্রহ, সড়কের অবস্থা যাচাই এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং প্রস্তুত করা হয়েছে।
সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে একটি গণপরিবহন মডেল তৈরি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে যাত্রী চলাচলের প্রবণতা, রুটের প্রয়োজনীয়তা এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে।
ডিটিসিএর হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৩২টি রুটে প্রতিদিন প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ লাখ যাত্রীর যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। এটি মোট পার্সন ট্রিপের প্রায় ৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত রুটগুলোর গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যমান বাস রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে বর্তমান বাস চলাচলের পথ ও অবকাঠামো ব্যবহার করেই নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।
ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ধ্রুব আলম বলেন, এ পরিকল্পনা কোনো অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সচল ৯৮টি বাস রুটে বিভিন্ন ধরনের জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামার তথ্য এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর যাত্রা শুরুর স্থান ও গন্তব্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মহানগরীর ৭২টি স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়েছে।মানচিত্র দেখুন
তিনি বলেন, প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের অবকাঠামোগত অবস্থাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ৩২টি রুটের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। যাত্রীদের চাহিদা বেশি এমন এলাকায় পর্যাপ্ত বাস নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় রুটের পুনরাবৃত্তি কমানোই এ পরিকল্পনার লক্ষ্য।
পরিকল্পনায় বিমানবন্দর, মিরপুর-১০, কুড়িল, গাবতলী, মহাখালী, ফার্মগেট, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ীকে কেন্দ্র করে একাধিক রুটের সংযোগ রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে চালুর জন্য প্রস্তাবিত ছয়টি রুট হলো—
১. গাজীপুরের শিববাড়ী চৌরাস্তা থেকে আব্দুল্লাহপুর হয়ে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির।
২. মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে সায়েন্সল্যাব হয়ে কেরানীগঞ্জের চুলকুটিয়া।
৩. মোহাম্মদপুরের বসিলার ঘাটারচর থেকে শাহবাগ ও মৎস্য ভবন হয়ে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার।
৪. মোহাম্মদপুরের বসিলা থেকে সায়েন্সল্যাব ও জিগাতলা হয়ে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড-কাঁচপুর ব্রিজ।
৫. মোহাম্মদপুরের ঘাটারচর থেকে মিরপুর-১০ হয়ে আব্দুল্লাহপুরের ধউর ব্রিজ।
৬. টঙ্গী কলেজগেট থেকে আব্দুল্লাহপুর হয়ে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির।
এসব রুটে ৭০ থেকে ২৫০টি পর্যন্ত নন-এসি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ফার্মগেট-পলাশী, মোহাম্মদপুরকেন্দ্রিক এবং উত্তরা এলাকায় তিনটি চক্রাকার বাস সার্ভিস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি চক্রাকার রুটে ২০টি করে বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনায় ঢাকা চাকা, রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ, ফোর স্টার বাস লাইন ও পিএনপি সিটি সার্ভিসসহ কয়েকটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাস রাখার জন্য বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে।


























