নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা যুগোপযোগী করতে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এবং সংশ্লিষ্ট যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি ২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন বেতন কাঠামো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর দেখানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে এ বিষয়ে ব্রিফিং করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এ সময় প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
নতুন বেতন স্কেলে দুটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেনশনভোগীদের নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা চালু। একই সঙ্গে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনা হয়েছে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সংশ্লিষ্ট বেতন কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সচিব কমিটি সুপারিশ প্রণয়ন করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে দেশের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমানো হয়েছে। বর্তমানে এ অনুপাত ১:৯.৯৪ থাকলেও নতুন স্কেলে তা ১:৭.৮ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ হবে।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন
অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বিবেচনায় নিয়ে পুরো বেতন স্কেল একসঙ্গে কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। আর ভাতাগুলো ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে একইভাবে তিন ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারি হিসাবে, নতুন বেতন স্কেলের আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবেন।
কোন গ্রেডে কত বেতন
গ্রেড বর্তমান মূল বেতন নতুন মূল বেতন
১ম ৭৮,০০০ ১,৫৬,০০০
২য় ৬৬,০০০ ১,৩২,০০০
৩য় ৫৬,৫০০ ১,১৩,০০০
৪র্থ ৫০,০০০ ১,০০,০০০
৫ম ৪৩,০০০ ৮৬,০০০
৬ষ্ঠ ৩৫,৫০০ ৭১,০০০
৭ম ২৯,০০০ ৫৮,০০০
৮ম ২৩,০০০ ৪৬,০০০
৯ম ২২,০০০ ৪৪,০০০
১০ম ১৬,০০০ ৩২,০০০
১১তম ১২,৫০০ ২৫,০০০
১২তম ১১,৩০০ ২৪,৩০০
১৩তম ১১,০০০ ২৪,০০০
১৪তম ১১,০০০ ২৪,০০০
১৫তম ৯,৭০০ ২৩,৫০০
১৬তম ৯,৩০০ ২১,৯০০
১৭তম ৯,০০০ ২১,৪০০
১৮তম ৮,৮০০ ২১,০০০
১৯তম ৮,৫০০ ২০,৫০০
২০তম ৮,২৫০ ২০,০০০
নতুন কাঠামোয় উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন দ্বিগুণ হলেও নিম্ন গ্রেডে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। ২০তম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ।
পেনশনে বড় পরিবর্তন
নতুন বেতন স্কেলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন (OROP) ব্যবস্থা আপাতত একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী—
৯ হাজার টাকা বা তদূর্ধ্ব নিট পেনশন: ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি
৯ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা: ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি
২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা: ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি
৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা: ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি
৪০ হাজার টাকা বা তদূর্ধ্ব: ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি
ফলে তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া বয়স্ক অবসরপ্রাপ্তরা বেশি হারে সুবিধা পাবেন।
সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা
সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া এতদিন শুধু পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেলেও নতুন বেতন স্কেলে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনা হয়েছে।
সরকারের মতে, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্যম বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ ও সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করা হয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল। ১১ বছর পর নতুন বেতন কাঠামো পেলেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং এটি আরও আগে হওয়া দরকার ছিল। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর ফলে বেসরকারি খাতেও চাপ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন। মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতেও বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, দেশের চলমান বিভিন্ন সংকটের সমাধান না করে সংকটময় সময়ে সরকারি খাতে বেতন বাড়ানো হয়েছে। এতে সরকার আর্থিক চাপের মুখে পড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।















