পাহাড়ে আলোর বাতিঘর উথোয়াইংগ্য মারমা, তাঁর অনুপ্রেরণায় স্বপ্ন দেখছে ১২০ শিশু
দুর্গম পাহাড়ি জনপদে জন্ম, জুমচাষি মা-বাবার সংসার, আর্থিক অনটন ও শিক্ষার সীমিত সুযোগ—সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে য়ংওয়াই ম্রো। সরকারি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বান্দরবান জেলায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেছে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী। তার স্বপ্ন বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়া এবং দুর্গম পাহাড়ের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে আলোর দিশারি হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন মানবিক উদ্যোগী উথোয়াইংগ্য মারমা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘রংখ্রেদঃ শিশু সদন’-এ আশ্রয় ও শিক্ষার সুযোগ পেয়ে য়ংওয়াইয়ের মতো প্রায় ১২০ শিশু নতুন করে স্বপ্ন দেখছে।
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার এক প্রত্যন্ত ম্রো পাড়ায় জুমচাষি মা-বাবার ঘরে জন্ম য়ংওয়াই ম্রোর। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বেড়ে ওঠা এই শিশুর পরিবারের পক্ষে পড়াশোনার ব্যয় বহন করা ছিল কঠিন। নিত্যদিনের সংসার চালানোই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে ছেলেকে উপজেলা সদরে রেখে পড়াশোনা করানো, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করা মা-বাবার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
তবে অভাবের মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল য়ংওয়াইয়ের। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন, বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে একসময় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে সেই স্বপ্ন। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না পেলে হয়তো থেমে যেতে পারত তার শিক্ষাজীবন।
সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ান উথোয়াইংগ্য মারমা
য়ংওয়াই ম্রোর জীবনে আশার আলো হয়ে আসেন বান্দরবানের লামা উপজেলার মানবিক উদ্যোগী উথোয়াইংগ্য মারমা। ২০২২ সালে য়ংওয়াইয়ের পড়াশোনার আগ্রহ ও মেধা দেখে তিনি তাকে নিজের পরিচালিত ‘রংখ্রেদঃ শিশু সদন’-এ আশ্রয় দেন।
সেখানে বিনা খরচে আবাসন, খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পড়াশোনার সুযোগ পেতে শুরু করে য়ংওয়াই। শিশু সদনের নিরাপদ পরিবেশ ও নিয়মিত পরিচর্যা তাকে লেখাপড়ায় মনোযোগী হতে সহায়তা করে। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যে শিশুর শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, সে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায়।
উথোয়াইংগ্য মারমার এই উদ্যোগ য়ংওয়াইয়ের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম দিয়ে সেই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার করতে থাকে সে।
ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন
এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বান্দরবান জেলায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করে য়ংওয়াই ম্রো। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানের এই সাফল্য তার পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের জন্য আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
তার এ অর্জন প্রমাণ করে, আর্থিক সংকট ও ভৌগোলিক প্রতিকূলতা থাকলেও যথাযথ সুযোগ, পরিচর্যা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সাফল্য অর্জন করতে পারে।
বিশেষ করে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপদ আবাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়। য়ংওয়াইয়ের সাফল্য সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ।
চিকিৎসক হয়ে পাহাড়ের মানুষের সেবা করতে চায়
ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে য়ংওয়াই ম্রো। পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসক হয়ে নিজের এলাকার মানুষের সেবা করতে চায় সে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অনেক মানুষকে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। চিকিৎসক, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতায় তাদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
য়ংওয়াইয়ের স্বপ্ন, একদিন চিকিৎসক হয়ে সেই মানুষের পাশে দাঁড়াবে। নিজের জীবনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে অর্জিত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চায় সে।
একটি শিশুর এই স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিজের জনগোষ্ঠী ও এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার প্রত্যয়। স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে প্রয়োজন ধারাবাহিক পড়াশোনা, উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা।
১২০ শিশুর আশ্রয়স্থল রংখ্রেদঃ শিশু সদন
য়ংওয়াই ম্রোর মতো দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া এলাকা থেকে আসা প্রায় ১২০ জন এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর শিক্ষা ও বেড়ে ওঠায় ভূমিকা রাখছে রংখ্রেদঃ শিশু সদন। প্রতিষ্ঠানটিতে আশ্রয় পাওয়া শিশুদের জন্য শিক্ষা, আবাসন ও মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিরাপদ আবাসন ও শিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা করা। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার যেসব শিশুর পরিবারের পক্ষে লেখাপড়ার ব্যয় বহন করা কঠিন, তাদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার পথ সুগম করতে পারে।
স্থানীয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিশু সদন গড়ে তুলতে উথোয়াইংগ্য মারমা নিজের সম্পত্তি বিক্রি করেছেন। ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যয় করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এমন উদ্যোগ গ্রহণ করায় স্থানীয়দের অনেকে তাঁর প্রশংসা করছেন।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এত শিশুর দায়িত্ব পালন করতে প্রয়োজন নিয়মিত আর্থিক সহায়তা, শিক্ষা উপকরণ, পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসাসেবা। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, দানশীল মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেলে শিশু সদনের কার্যক্রম আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
‘আরও অনেক তরুণ যেন অনুপ্রাণিত হন’
উথোয়াইংগ্য মারমা বলেন, ‘আমি চেষ্টা করছি এমন কিছু করার, যা আগামীতে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। যেন আরও অনেক তরুণ পাহাড়ের এতিম ও হতদরিদ্র শিশুদের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন।’
তাঁর এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু শিশুদের আশ্রয় দেওয়া নয়; বরং তাদের শিক্ষিত করে আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করা। তাঁর প্রত্যাশা, সমাজের অন্যরাও এগিয়ে এলে পাহাড়ের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর হবে।
স্থানীয়দের মতে, উথোয়াইংগ্য মারমার এই মানবিক উদ্যোগকে বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করলে তিনি আরও উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে আরও বেশি শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা এবং তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সহজ হবে।
একটি সাফল্য, অনেক শিশুর অনুপ্রেরণা
য়ংওয়াই ম্রোর গল্প কেবল বৃত্তি অর্জনের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, একটি শিশুর মেধা বিকাশে সঠিক সময়ে সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত পাড়ায় জন্ম নেওয়া য়ংওয়াই আজ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তার এই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন ধারাবাহিক শিক্ষার সুযোগ, অধ্যবসায় ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা।
অন্যদিকে, উথোয়াইংগ্য মারমার উদ্যোগে রংখ্রেদঃ শিশু সদনে আশ্রয় পাওয়া প্রায় ১২০ শিশুর সামনে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনার পথ। তাদের প্রত্যেকের স্বপ্ন হয়তো আলাদা, কিন্তু শিক্ষার আলোয় নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা এক।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হোক—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের। য়ংওয়াইয়ের মতো শিশুরা একদিন নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখুক, আর উথোয়াইংগ্য মারমার মানবিক উদ্যোগ হয়ে উঠুক অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর।
























