1. admin@kagojerbarta.com : admin :
ঢাকা ১২:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

অনলাইন ডেস্ক
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ফুটবল কেবল ২২ জন মানুষের পায়ের লড়াই নয়, ফুটবল হলো হৃৎস্পন্দনের ওঠা-নামা, এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান যেখানে প্রতি সেকেন্ডে চিত্রনাট্য বদলায়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ঠিক তেমনই এক অতিপ্রাকৃতিক, স্নায়ুক্ষয়ী এবং রোমাঞ্চে ঠাসা রুদ্ধশ্বাস নাটকের সাক্ষী হলো বিশ্ববাসী।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের ইস্পাতকঠিন রক্ষণব্যূহ গুঁড়িয়ে দিয়ে, অতিরিক্ত সময়ের চরম নাটকীয়তায় ৩-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটলো লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। যে ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক ক্ল্যাসিক ট্র্যাজেডি আর মহাকাব্যের মিশ্রণে, সেখানে শেষ হাসি হাসলো লাতিন আমেরিকার ফুটবল জাদুকররাই।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ছিল আর্জেন্টিনার চেনা ছন্দের এক নিখুঁত প্রদর্শনী। রেফারির বাঁশি বাজার পর থেকেই মাঠের সবুজ ক্যানভাসে আলবিসেলেস্তেরা আঁকতে শুরু করে তাদের চিরচেনা পাসের আল্পনা।

ম্যাচের বয়স যখন মাত্র ১০ মিনিট, তখনই স্টেডিয়ামজুড়ে আছড়ে পড়ে আকাশি-সাদা সমুদ্রের গর্জন। মাঝমাঠ থেকে তৈরি হওয়া এক জাদুকরী আক্রমণ সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্সকে বোকা বানিয়ে বল এনে দেয় আলেক্সিস মাক আলিস্তেরের পায়ে। কোনো ভুল করেননি এই মিডফিল্ডার; তার ডান পায়ের মাপা, বুলেটগতির শট সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলকে পরাস্ত করে জড়িয়ে যায় জালে। ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে আর্জেন্টিনা যেন জানান দিচ্ছিল, আজ তারা মাঠ ছাড়তে এসেছে রাজকীয়ভাবে। প্রথমার্ধের বাকিটা সময় সুইসরা কেবল বুক চিতিয়ে আর্জেন্টিনার সেই আক্রমণের সুনামি ঠেকিয়ে গেছে।

তবে বিরতির পর গল্পটা বদলে যেতে শুরু করে। ফুটবল বিধাতা যেন সুইজারল্যান্ডের জন্য অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বের হয় সুইসরা। আল্পস পর্বতমালার মতোই অনড় আর হিমশীতল মানসিকতা নিয়ে তারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।

ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো অ্যারোহেড স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের সামান্যতম অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে দান এনদয়ে নিখুঁত এক কোণাকুণি স্ট্রাইকে বল পাঠিয়ে দেন আর্জেন্টিনার জালে। ১-১! সমতায় ফেরে ম্যাচ। গ্যালারিতে তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন লাল-সাদা সমর্থকেরা, আর আর্জেন্টিনার শিবিরে ভর করে এক অজানা শঙ্কা।

নাটকের তখনও অনেক বাকি ছিল। সমতা ফেরার ঠিক পাঁচ মিনিট পর, ৭২তম মিনিটে ম্যাচে আসে এক টার্নিং পয়েন্ট। আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সঙ্গে এক উগ্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন সুইস ফরোয়ার্ড ব্রেল এমবোলো। রেফারি ভিএআর (VAR)-এর নতুন ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ নিয়মের সাহায্য নিয়ে এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন।

১০ জনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড। সমতায় থাকা সুইসদের পিঠ তখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, আর আর্জেন্টিনা মেতে ওঠে রক্তপিপাসু শিকারির মতো আক্রমণে। কিন্তু ১০ জন নিয়েও সুইজারল্যান্ড যা খেলল, তাকে ফুটবলীয় ভাষায় কেবল ‘বীরত্ব’ বললেও কম বলা হবে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৯ মিনিটের ইনজুরি সময়েও আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ তারা রুখে দেয় অলৌকিকভাবে। কখনো গোলপোস্ট, কখনো গোলরক্ষক কোবেলের অতিমানবীয় সেভ ম্যাচটিকে টেনে নিয়ে যায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেও কাটেনি ডেডলক। লিওনেল মেসি বারবার সুইস ডিফেন্সের দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছিলেন, গ্যালারিতে তখন নখ কামড়ানো উত্তেজনা। পেনাল্টি শুটআউটের ভূত যখন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ঘাড়ে চাপতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

ম্যাচের ১১২তম মিনিট- ইতিহাসের পাতায় যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বদলি ফুটবলার হোসে ম্যানুয়েল লোপেজের পাস থেকে বল পান ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেস। পেনাল্টি বক্সের বাম প্রান্ত থেকে আলভারেস নিলেন এক অবিশ্বাস্য, বাঁকানো শট। ফুটবলটি যেন বাতাসে এক অদৃশ্য বৃত্ত এঁকে সুইস গোলরক্ষকের প্রসারিত হাতকে ফাঁকি দিয়ে টপ কর্নার দিয়ে জালে আছড়ে পড়ল। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা।

সুইজারল্যান্ড যখন সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে অল-আউট আক্রমণে উঠেছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে, অতিরিক্ত সময়ের ইনজুরি টাইমে (১২০+১ মিনিট) সুইসদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন লাউতারো মার্তিনেস। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে পাওয়া বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন তিনি।

সেই গোলের পর অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে যা হলো, তাকে শব্দে রূপ দেওয়া অসম্ভব। এক অবিশ্বাস্য উন্মাদনায় মেতে উঠল আর্জেন্টিনার ডাগআউট। রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই নিশ্চিত হয়ে যায়- সব বাধা, সব শঙ্কা আর রক্তচাপ বাড়ানো রোমাঞ্চ পেরিয়ে ৩-১ ব্যবধানে সেমিফাইনালে পা রাখলো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এ ম্যাচ চিরকাল বেঁচে থাকবে এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য হিসেবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ০৯:০৫:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

আপডেট সময় : ০৯:০৫:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

ফুটবল কেবল ২২ জন মানুষের পায়ের লড়াই নয়, ফুটবল হলো হৃৎস্পন্দনের ওঠা-নামা, এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান যেখানে প্রতি সেকেন্ডে চিত্রনাট্য বদলায়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ঠিক তেমনই এক অতিপ্রাকৃতিক, স্নায়ুক্ষয়ী এবং রোমাঞ্চে ঠাসা রুদ্ধশ্বাস নাটকের সাক্ষী হলো বিশ্ববাসী।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের ইস্পাতকঠিন রক্ষণব্যূহ গুঁড়িয়ে দিয়ে, অতিরিক্ত সময়ের চরম নাটকীয়তায় ৩-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটলো লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। যে ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক ক্ল্যাসিক ট্র্যাজেডি আর মহাকাব্যের মিশ্রণে, সেখানে শেষ হাসি হাসলো লাতিন আমেরিকার ফুটবল জাদুকররাই।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ছিল আর্জেন্টিনার চেনা ছন্দের এক নিখুঁত প্রদর্শনী। রেফারির বাঁশি বাজার পর থেকেই মাঠের সবুজ ক্যানভাসে আলবিসেলেস্তেরা আঁকতে শুরু করে তাদের চিরচেনা পাসের আল্পনা।

ম্যাচের বয়স যখন মাত্র ১০ মিনিট, তখনই স্টেডিয়ামজুড়ে আছড়ে পড়ে আকাশি-সাদা সমুদ্রের গর্জন। মাঝমাঠ থেকে তৈরি হওয়া এক জাদুকরী আক্রমণ সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্সকে বোকা বানিয়ে বল এনে দেয় আলেক্সিস মাক আলিস্তেরের পায়ে। কোনো ভুল করেননি এই মিডফিল্ডার; তার ডান পায়ের মাপা, বুলেটগতির শট সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলকে পরাস্ত করে জড়িয়ে যায় জালে। ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে আর্জেন্টিনা যেন জানান দিচ্ছিল, আজ তারা মাঠ ছাড়তে এসেছে রাজকীয়ভাবে। প্রথমার্ধের বাকিটা সময় সুইসরা কেবল বুক চিতিয়ে আর্জেন্টিনার সেই আক্রমণের সুনামি ঠেকিয়ে গেছে।

তবে বিরতির পর গল্পটা বদলে যেতে শুরু করে। ফুটবল বিধাতা যেন সুইজারল্যান্ডের জন্য অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বের হয় সুইসরা। আল্পস পর্বতমালার মতোই অনড় আর হিমশীতল মানসিকতা নিয়ে তারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।

ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো অ্যারোহেড স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের সামান্যতম অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে দান এনদয়ে নিখুঁত এক কোণাকুণি স্ট্রাইকে বল পাঠিয়ে দেন আর্জেন্টিনার জালে। ১-১! সমতায় ফেরে ম্যাচ। গ্যালারিতে তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন লাল-সাদা সমর্থকেরা, আর আর্জেন্টিনার শিবিরে ভর করে এক অজানা শঙ্কা।

নাটকের তখনও অনেক বাকি ছিল। সমতা ফেরার ঠিক পাঁচ মিনিট পর, ৭২তম মিনিটে ম্যাচে আসে এক টার্নিং পয়েন্ট। আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সঙ্গে এক উগ্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন সুইস ফরোয়ার্ড ব্রেল এমবোলো। রেফারি ভিএআর (VAR)-এর নতুন ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ নিয়মের সাহায্য নিয়ে এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন।

১০ জনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড। সমতায় থাকা সুইসদের পিঠ তখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, আর আর্জেন্টিনা মেতে ওঠে রক্তপিপাসু শিকারির মতো আক্রমণে। কিন্তু ১০ জন নিয়েও সুইজারল্যান্ড যা খেলল, তাকে ফুটবলীয় ভাষায় কেবল ‘বীরত্ব’ বললেও কম বলা হবে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৯ মিনিটের ইনজুরি সময়েও আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ তারা রুখে দেয় অলৌকিকভাবে। কখনো গোলপোস্ট, কখনো গোলরক্ষক কোবেলের অতিমানবীয় সেভ ম্যাচটিকে টেনে নিয়ে যায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেও কাটেনি ডেডলক। লিওনেল মেসি বারবার সুইস ডিফেন্সের দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছিলেন, গ্যালারিতে তখন নখ কামড়ানো উত্তেজনা। পেনাল্টি শুটআউটের ভূত যখন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ঘাড়ে চাপতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

ম্যাচের ১১২তম মিনিট- ইতিহাসের পাতায় যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বদলি ফুটবলার হোসে ম্যানুয়েল লোপেজের পাস থেকে বল পান ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেস। পেনাল্টি বক্সের বাম প্রান্ত থেকে আলভারেস নিলেন এক অবিশ্বাস্য, বাঁকানো শট। ফুটবলটি যেন বাতাসে এক অদৃশ্য বৃত্ত এঁকে সুইস গোলরক্ষকের প্রসারিত হাতকে ফাঁকি দিয়ে টপ কর্নার দিয়ে জালে আছড়ে পড়ল। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা।

সুইজারল্যান্ড যখন সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে অল-আউট আক্রমণে উঠেছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে, অতিরিক্ত সময়ের ইনজুরি টাইমে (১২০+১ মিনিট) সুইসদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন লাউতারো মার্তিনেস। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে পাওয়া বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন তিনি।

সেই গোলের পর অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে যা হলো, তাকে শব্দে রূপ দেওয়া অসম্ভব। এক অবিশ্বাস্য উন্মাদনায় মেতে উঠল আর্জেন্টিনার ডাগআউট। রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই নিশ্চিত হয়ে যায়- সব বাধা, সব শঙ্কা আর রক্তচাপ বাড়ানো রোমাঞ্চ পেরিয়ে ৩-১ ব্যবধানে সেমিফাইনালে পা রাখলো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এ ম্যাচ চিরকাল বেঁচে থাকবে এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য হিসেবে।