জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: বাংলাদেশকে পুনর্গঠনে 3-R কৌশল
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ভাষণে তিনি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপরেখা, বিশ্বশান্তি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈষম্যহীন ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দেশ পুনর্গঠনে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার রিকভারি, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন (Recovery, Restoration and Reconstruction) অর্থাৎ থ্রি-আর (3-R) কৌশল অনুসরণ করছে।’
ভাষণের শুরুতে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। দীর্ঘ সময়ের শাসনের পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন
ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ অবিচল সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারে
দীর্ঘ নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের কারণে দেশের সম্পদ ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।’
এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ করার পরিকল্পনা
দেশের কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথা জানান তিনি। এ কর্মযজ্ঞে উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে থাকার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।
নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্ব
দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আর্থ-সামাজিক রূপান্তরে নারীদের সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে।
নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করার কথা জানান তিনি।
‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা
শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতের কার্ডগুলো সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের পরিকল্পনা
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা কম হলেও এর বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে।
ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে কপ-৩১-এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি, ক্লিন এনার্জি ও সোলার এনার্জির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা-খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি ও পানি সংরক্ষণে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
এআই ব্যবহারে বৈষম্য চান না তারেক রহমান
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়োটেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।’
ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে এআই বিভাজনে পরিণত না হয়—এমন সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, ‘সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি—সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সব নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে ভাষণ শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।



























