কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে শতাধিক পৃষ্ঠপোষক, অভিযান জোরদারের নির্দেশ
খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার, দখল ও আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বাড়ছে। বিভিন্ন ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও তাদের পেছনে থাকা মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকদের বড় একটি অংশ এখনো আইনের আওতার বাইরে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় ১৫৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যা শতাধিক বলে একাধিক সূত্রের দাবি। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী, সন্ত্রাসী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাংয়ের কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হলে তাকে আইনি সহায়তা দেওয়া, জামিনের ব্যবস্থা করা কিংবা কারাগারে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে। ফলে গ্রেপ্তার ও মামলা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে গ্যাংয়ের কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। বরং নতুন সদস্য যুক্ত হয়ে এসব গ্যাং আরও সংঘবদ্ধ হচ্ছে।
অভিযানে জোর
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে হালনাগাদ তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা এবং মোহাম্মদপুরে দখলবাজির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান শুরু হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। আগামী বুধবারের পর এ অভিযান আরও জোরদার হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন গ্যাংয়ে জড়িত ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরদের আটক করে মুচলেকার মাধ্যমে পরিবারের জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে একই কিশোর দ্বিতীয়বার অপরাধে জড়ালে ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করতে বলা হয়েছে।
ঢাকায় শতাধিক পৃষ্ঠপোষকের তথ্য
একাধিক সূত্রের দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় ১৫৮টি কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে শতাধিক পৃষ্ঠপোষক রয়েছেন। এসব পৃষ্ঠপোষকের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি, স্থানীয় প্রভাবশালী, সন্ত্রাসী এবং বিভিন্ন আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্রের দেওয়া তালিকায় মিরপুর, কাফরুল, পল্লবী, রূপনগর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, তুরাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখান, উত্তরা, ভাটারা, বনানী, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, গেন্ডারিয়া, খিলগাঁও, রামপুরা, শাহজাহানপুর, হাজারীবাগ, লালবাগ ও চকবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার একাধিক গ্যাংয়ের নাম রয়েছে।
তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নাম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে প্রত্যেকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন।
পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা চায় পুলিশ
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান বলেন, সারা দেশে কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা ছাড়া অন্যান্য মহানগর ও জেলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন শত শত অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরপাকড়ের মাধ্যমে কিশোর অপরাধ পুরোপুরি কমানো সম্ভব নয়। কিশোর অপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শুধু সদস্যদের গ্রেপ্তার নয়, অর্থের উৎস, রাজনৈতিক বা সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ শনাক্ত করাও জরুরি। একই সঙ্গে কিশোরদের পুনর্বাসন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
























