সেন্টমার্টিনে নভেম্বরে দিনে ভ্রমণ, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে রাত্রিযাপন
আগামী ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। পর্যটকেরা দ্বীপটিতে যেতে পারবেন আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত। এ বছর প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। তবে দ্বীপের নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের গত বছরের জারি করা নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ওই নির্দেশনায় উল্লেখ আছে, নভেম্বর মাসে দিনে গিয়ে দিনে ফিরতে হবে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ থাকবে দ্বীপটি। এবারও রাতযাপন করা যাবে শুধু ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে। দ্বীপে যেতে পর্যটকদের নিতে হবে ট্রাভেল পাসও।
মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান বলেন, আগের প্রজ্ঞাপনে যা ছিল, সেটাই অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ এবার সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতের সময়সীমা বাড়লেও রাতযাপনের ক্ষেত্রে গত বছরের নিয়মই বহাল থাকছে।
তবে গত বছরের প্রজ্ঞাপনে ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটকদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ ছিল দ্বীপটি। এবার আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সময় বর্ধিত করা হলেও এই ১৫ দিন কেবল দিনে ভ্রমণ করা যাবে নাকি রাত্রিযাপনও করা যাবে- সে বিষয়ে কিছু জানা যায় নি।
পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত নিয়ে গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রোববার মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে গত বছরের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাগুলোও বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর সেন্টমার্টিনে নৌযান চলাচলের অনুমতি দিতে পারবে না। নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করবে। পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
গত বছরের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল ভ্রমণের সময়সীমা, রাত্রিযাপন, পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ১২টি নির্দেশনা। নতুন প্রজ্ঞাপনে আগের নির্দেশনাগুলো বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
আগের নির্দেশনা অনুযায়ী, পর্যটকদের বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড থাকতে হবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে। নভেম্বর মাসে পর্যটকরা শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণ করতে পারবেন, রাত্রিযাপন করা যাবে না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাত্রিযাপনের অনুমতি থাকবে। ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারবেন না। সেন্ট মার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি ও বারবিকিউ পার্টি নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ সব ধরনের মোটরচালিত যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বহন না করার নির্দেশনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, পর্যটকদের টিকিটের সঙ্গে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড যুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বোর্ডের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য রয়েছে। অতীতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ও পরিবেশদূষণের কারণে দ্বীপটির প্রতিবেশব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণে পর্যটকের যাতায়াত ও অবস্থানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণ সীমিত করা হয়। গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ওই মাসে পর্যটকেরা সেখানে যেতে পারেননি। নভেম্বরে দ্বীপে রাত্রিযাপনেরও সুযোগ ছিল না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাস রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছিল। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ ও সেখানে রাত্রিযাপনের সুযোগ পেয়েছিলেন।
চার বছর আগেও টেকনাফ থেকে প্রতিদিন ৯ থেকে ১১টি জাহাজে পাঁচ থেকে ছয় হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিনে যেতেন। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, নাফ নদীতে বাংলাদেশি ট্রলার ও যাত্রীবাহী নৌযানে গুলিবর্ষণ এবং নৌকাসহ বাংলাদেশিদের অপহরণের ঘটনায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন পথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে মৌসুমের সময় পর্যটকবাহী ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল সৈকত দিয়ে চলাচল করত। এতে শামুক-ঝিনুকসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী মারা গেছে। গত ৯ মাস ধরে পর্যটক না থাকায় সৈকতে শামুক-ঝিনুকের বংশবিস্তার ঘটছে। প্রবাল-শৈবাল আহরণ বন্ধ আছে।
























