সাংবাদিকতা বনাম এজেন্ডা: অতীত ও বর্তমানের প্রেক্ষাপটে বিবেকের মুখোমুখি
মোঃ সাদিকুল ইসলাম
সংগঠক, সংবাদকর্মী ও কলামিস্ট
সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ আর সংবাদকর্মীরা হলেন সেই দর্পণের আলো, যিনি সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকে উন্মোচিত করেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে একটি মৌলিক প্রশ্ন খুব জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে—সংবাদকর্মীরা কি কেবলই তাদের এলাকার নিরপেক্ষ সত্য ঘটনা তুলে ধরছেন, নাকি তারা কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যম হয়ে উঠছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সংবাদমাধ্যমের অতীত ও বর্তমানের চালচিত্রের দিকে তাকাতে হবে।
আমাদের দেশে সাংবাদিকতার একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। অতীতে গ্রামীণ বা স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতা ছিল মূলত জনবান্ধব ও সাহসী। সংবাদকর্মীরা নিজেদের এলাকার সুবিধা-বঞ্চিত মানুষের কথা, স্থানীয় সমস্যা ও শাসকগোষ্ঠী বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে জীবনের ঝুঁকি নিতেন। কোনো দলের স্বার্থ রক্ষা করা নয়, বরং সত্যকে অনাবিল রেখে তুলে ধরাই ছিল তাদের মূল ব্রত। সাংবাদিকতাকে সে সময় পেশার চেয়ে ‘ব্রত’ বা সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বেশি দেখা হতো।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতার এই ধারা অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও মিডিয়া হাউজের ব্যাপ্তির ফলে সংবাদের গতি বেড়েছে সত্যি, কিন্তু একই সাথে সংবাদের নিরপেক্ষতা ও গুণগত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্নচিহ্ন।
আজকের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দুটি ভিন্ন চিত্র সামনে আসে:
১. একদল সত্যান্বেষী সংবাদকর্মী: এখনও বহু সংবাদকর্মী রয়েছেন যারা শত প্রতিকূলতা, হুমকি ও আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও কেবল নিজ নিজ এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং প্রকৃত সত্য ঘটনা নিষ্ঠার সাথে তুলে ধরেন। তাদের কাজ কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ নয়, বরং নিখাদ জনস্বার্থভিত্তিক।
২. এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা: অন্যদিকে, একশ্রেণীর সংবাদকর্মী বা মিডিয়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘সিলেক্টিভ রিপোর্টিং’ বা পক্ষপাতমূলক উপস্থাপনা দেখা যায়—যেখানে নির্দিষ্ট দলের সুবিধা হয় এমন ঘটনাকে বড় করে দেখানো হয় এবং বিরোধী বা ভিন্ন মতের নিরপেক্ষ ঘটনাকে চেপে যাওয়া হয়। মিডিয়া হাউজগুলোর মালিকানার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, দলীয় স্বার্থ হাসিল এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সাথে ব্যক্তি-স্বার্থের লেনদেন এর পেছনে বড় কারণ।
বর্তমান ও অতীতের এই পরিবর্তন থেকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের এবং বিশেষ করে তরুণ সংবাদকর্মীদের জন্য কিছু গভীর শিক্ষণীয় দিক রয়েছে:
সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা: একজন সংবাদকর্মীর প্রাথমিক ও প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত তিনি ‘সত্যের পক্ষে’। কোনো দল বা মতাদর্শ যেন সংবাদের নিরপেক্ষতাকে গ্রাস করতে না পারে। রাজনৈতিক আনুগত্য সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বকে ধ্বংস করে।
সচেতন পাঠক ও নাগরিক তৈরি: সাধারণ জনগণকেও সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা বিচারে সচেতন হতে হবে। একটি খবর পড়ার পর তা কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে প্রচার চালনা (Propaganda) নাকি নিরপেক্ষ তথ্য—তা বিচার করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ: সংবাদকর্মীদের অতীতের সেই নীতি-নৈতিকতার ঐতিহ্যে ফিরে যেতে হবে। সমাজকে ভুল তথ্য দিয়ে সাময়িক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সংবাদমাধ্যমের ওপর জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়।
সংবাদকর্মীরা যদি কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন, তবে সমাজ থেকে ন্যায়বিচার ও সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। এলাকার কেবল ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা এবং ক্ষমতার মুখোমুখি হয়ে সত্য বলাটাই সাংবাদিকতার মূল সৌন্দর্য। বর্তমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সাংবাদিকতার এই মূল চেতনাকে টিকিয়ে রাখাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও শিক্ষা।


























