তিন দশকেও থামেনি মানুষ-হাতির সংঘাত, প্রাণ গেছে ৫৯ জনের
গারো পাহাড়ে ২৯ মানুষের মৃত্যু, ৩০ হাতির প্রাণহানি; অভয়ারণ্য ও আন্তদেশীয় করিডর গড়ার নতুন পরিকল্পনা।
শেরপুরের গারো পাহাড়ে মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত দীর্ঘ তিন দশকেও কমেনি। একের পর এক উদ্যোগ, প্রকল্প গ্রহণ এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদে কাটছে না আতঙ্ক। হাতির আক্রমণে প্রাণহানি, ফসলের ক্ষতি ও বসতবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদসহ বিভিন্ন কারণে মারা যাচ্ছে বন্যহাতিও।
সংঘাত নিরসনে সৌরবিদ্যুৎচালিত বেড়া, হাতির খাদ্য উপযোগী গাছ লাগানো এবং এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে স্থানীয়দের। দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় এবার হাতির অভয়ারণ্য, স্থায়ী খাদ্যভান্ডার ও আন্তদেশীয় চলাচলের করিডর গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না পাহাড়ের বাসিন্দাদের।
তিন দশকে ২৯ মানুষের মৃত্যু, হাতি মারা গেছে ৩০টি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, ১৯৯৬ সাল থেকে মানুষ ও হাতির সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরে নেই। তবে ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংঘাতে ২৯ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ৩০টি বন্যহাতি।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে গারো পাহাড় এলাকায় প্রায় ১৩৫ থেকে ১৪০টি বন্যহাতি অবস্থান করছে।
মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া থাকায় হাতির দল সহজে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে হাতিগুলো বাংলাদেশের অংশে অনেকটা আটকে পড়ছে।
সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ি জনপদে আতঙ্ক
শেরপুরের সীমান্তবর্তী প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় সন্ধ্যা নামার পর বন থেকে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসে বন্যহাতির পাল। ধান, শাকসবজি, কলাগাছ, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল ও ফলদ গাছ নষ্ট করে তারা। কখনো ঘরে ঢুকে ধান-চাল খেয়ে ফেলে, কখনো পায়ের নিচে পিষে নষ্ট করে কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম। ভেঙে ফেলে বসতবাড়িও।
হাতির ভয়ে অনেক কৃষক জমিতে চাষাবাদ করতে সাহস পান না। আবার জীবিকার তাগিদে যারা চাষ করেন, তাদের অনেকেই ফসল ঘরে তোলার আগেই ক্ষতির মুখে পড়েন। এতে কৃষকের আর্থিক সংকট বাড়ার পাশাপাশি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে পরিবারের খাদ্য ও জীবিকা।
ধান কাটার মৌসুম সামনে রেখে হাতির আনাগোনা ও সংঘাত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কোটি টাকা ব্যয়ের উদ্যোগেও মিলছে না প্রত্যাশিত সুফল
মানুষ-হাতির সংঘাত কমাতে ২০১৪ সালে তাওয়াকোচা ও বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ এলাকায় হাতির খাদ্য হিসেবে বাঁশ, কলাগাছসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সময়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় স্থাপন করা হয় সৌরবিদ্যুৎচালিত বেড়া বা সোলার ফেন্সিং।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বেড়ার বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে হাতির চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকাতে এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি।
হাতির আক্রমণ সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতে সীমান্তবর্তী এলাকায় ১০টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়। প্রতিটি দলে রয়েছেন ১০ জন করে সদস্য। কিন্তু প্রয়োজনের সময় এসব দলের সদস্যদের পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকলে অনেক সময় নিজেদের ঝুঁকি নিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হয় গ্রামবাসীদের।
হাতি তাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও সংকট রয়েছে। মাঝেমধ্যে টর্চলাইট বিতরণ করা হলেও দুর্গম এলাকার অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
গোমড়া গ্রামের সখিনা বেগম, আকলিমা বেগম, আবুল কাশেম ও আনোয়ার হোসেন জানান, হাতির আক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই তাদের বসবাস করতে হয়। রাতে হাতি তাড়ানোর প্রস্তুতি হিসেবে দুই লিটার কেরোসিন তেল ও টর্চলাইট কাছে রাখতে হয়। কিন্তু দরিদ্র অনেক পরিবারের পক্ষে এসব সরঞ্জাম সংগ্রহ করাও কঠিন।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজি মোহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে অভয়ারণ্য গড়ে তোলার অংশ হিসেবে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে বনাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে। হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
বনভূমি দখল ও খাদ্যসংকটে বাড়ছে সংঘাত
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন বিভাগের জমির পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার একর। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার একর জমি বেদখলে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বেদখল বনভূমির পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার একর। এসব জমিতে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, চলছে চাষাবাদ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বনভূমি দখল, হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া এবং প্রাকৃতিক খাদ্যের ঘাটতি মানুষ-হাতির সংঘাতের অন্যতম কারণ। হাতির স্বাভাবিক আবাসস্থল ও খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে শুধু লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
এ পরিস্থিতিতে বনভূমি দখলমুক্ত করা, হাতির চলাচলের পথ চিহ্নিত করা, প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং বনাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের পুনর্বাসনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি উঠেছে।
অভয়ারণ্য ও আন্তদেশীয় করিডর গড়ার ঘোষণা
দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে এবার হাতির অভয়ারণ্য, স্থায়ী খাদ্যভান্ডার ও আন্তদেশীয় হাতি চলাচলের করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।
গত ১০ অক্টোবর ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে জেলা প্রশাসন ও ময়মনসিংহ বন বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ ঘোষণা দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. আবদুল আউয়াল পিন্টু। জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে সভায় বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং হাতি সংরক্ষণবিষয়ক প্রাণিবিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন এ পরিকল্পনা স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও বাস্তবায়নের সময়সীমা, নির্ধারিত স্থান, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের আশঙ্কা, আগের উদ্যোগগুলোর মতো নতুন পরিকল্পনাও যথাযথ বাস্তবায়ন ও তদারকির অভাবে থমকে গেলে সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে না।
ঘোষণা নয়, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
স্থানীয়দের মতে, মানুষ ও হাতির সংঘাত নিরসনে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অকেজো সোলার ফেন্সিং সচল করা, ইআরটি সদস্যদের কার্যক্রম জোরদার করা, হাতির নিরাপদ চলাচলের পথ সংরক্ষণ এবং পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলোতে আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা চালু, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং হাতির আক্রমণ মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
তিন দশকের সংঘাতে ২৯ জন মানুষের মৃত্যু, ৩০টি হাতির প্রাণহানি এবং বিপুল সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি প্রমাণ করে, সমস্যাটি কেবল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত অভয়ারণ্য, স্থায়ী খাদ্যভান্ডার ও আন্তদেশীয় করিডর কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে গারো পাহাড়ে মানুষ ও বন্যহাতির দীর্ঘদিনের সংঘাত কমার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।


























