বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় কোথায়? জেনে নিন মৌসিনরামের বিস্ময়কর গল্প
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার ছোট্ট গ্রাম মৌসিনরামে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থান হিসেবে স্বীকৃত এই গ্রামের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১১ হাজার ৮৭২ মিলিমিটার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে একই রাজ্যের বিখ্যাত চেরাপুঞ্জি, যেখানে বছরে গড়ে ১১ হাজার ৭৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
একদিনেই এক মিটারের কাছাকাছি বৃষ্টি
চলতি বছরের জুনে মেঘালয়ে অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ রেকর্ড করা হয়। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) জানায়, ১৮ জুনের আগের ২৪ ঘণ্টায় চেরাপুঞ্জিতে ৯৭২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা গত ১২২ বছরের মধ্যে এক দিনে তৃতীয় সর্বোচ্চ। একই সময়ে মৌসিনরামে ১ হাজার ৩.৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়, ফলে ওই দিন চেরাপুঞ্জিকেও ছাড়িয়ে যায় মৌসিনরাম।
কেন এত বৃষ্টি হয়?
মৌসিনরাম বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তের খুব কাছেই অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পাহাড়ি এলাকায় বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্পে ভরা মেঘ উত্তর দিকে উঠে এসে খাসি পাহাড়ে বাধা পায়। এরপর সেই মেঘ ঘনীভূত হয়ে মৌসিনরাম ও চেরাপুঞ্জি এলাকায় প্রবল বর্ষণ ঘটায়। এই ভৌগোলিক অবস্থানই অঞ্চলটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থানে পরিণত করেছে।
বৃষ্টির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া জীবন
বছরের অধিকাংশ সময় বৃষ্টির মধ্যে কাটালেও স্থানীয়দের জীবন থেমে থাকে না। অনেক বাড়িই শব্দরোধীভাবে নির্মিত, যাতে টানা বৃষ্টির শব্দে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত না হয়।
এখানকার মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘নাপস’ নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ছাতা। বাঁশ ও কলাপাতা দিয়ে তৈরি এই ছাতা শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢেকে রাখে এবং প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেয়। কৃষকদেরও এই ছাতা ব্যবহার করে মাঠে কাজ করতে দেখা যায়।
তবে অতিবৃষ্টির কারণে অনেক সময় স্কুলের ক্লাস বাতিল হয় এবং বর্ষাকালে মানুষ দিনের বড় একটি অংশ ঘরেই কাটায়।
পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র
কুয়াশায় মোড়া পাহাড়, অসংখ্য জলপ্রপাত, সবুজ উপত্যকা এবং শীতল আবহাওয়া মৌসিনরামকে অনন্য সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলেছে। বর্ষাকালে কখনো কখনো দৃশ্যমানতা মাত্র ১০ মিটার পর্যন্ত নেমে আসে। গ্রামের প্রবেশমুখে থাকা ‘Mawsynram Village’ সাইনবোর্ড পার হলেই শুরু হয় প্রকৃতির এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল গ্রাম হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়ার পর ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
চেরাপুঞ্জিকে ছাড়িয়ে শীর্ষে
একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল চেরাপুঞ্জি। তবে দীর্ঘমেয়াদি বৃষ্টিপাতের গড় হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে শীর্ষস্থান দখল করেছে মৌসিনরাম।
মৌসিনরাম (১৯৭৪–২০২২): গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১১,৮০২.৪ মিলিমিটার
চেরাপুঞ্জি (১৯৭১–২০২০): গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১১,৩৫৯.৪ মিলিমিটার
বিশ্বের বৃষ্টিবহুল এলাকার তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে কলম্বিয়ার তুতোনেন্দো।
নতুন দাবিদারও রয়েছে
সম্প্রতি ভারতের অরুণাচল প্রদেশের কলোরিয়াং শহরের বাসিন্দারা দাবি করেছেন, সঠিকভাবে পরিমাপ করা হলে তাদের এলাকাতেও মৌসিনরামের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়। তবে এ দাবির পক্ষে এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি। তাই বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিস্নাত এলাকার স্বীকৃতি এখনো মৌসিনরামের দখলেই রয়েছে।
সিলেট ও ময়মনসিংহে বেশি বৃষ্টি কেন?
বাংলাদেশের সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বেশি বৃষ্টির প্রধান কারণও একই। বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্প বহনকারী মেঘ উত্তর দিকে এসে মেঘালয় ও গারো পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে পাহাড়সংলগ্ন বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটে।
আবার মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ে হওয়া অতিবৃষ্টির পানি নেমে আসে বাংলাদেশের সমতলে। এতে বর্ষাকালে বন্যা দেখা দিলেও পাহাড়ি নদীগুলো যে পলি বয়ে আনে, তা দেশের কৃষিজমিকে উর্বর করে তোলে। তবে একই সঙ্গে বন্যা মানুষের জীবন-জীবিকা ও বসতবাড়ির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।


























