অধিগ্রহণের ১ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা -অফিস সহকারি খালিদের ৬০ লক্ষ টাকার ঘুষ গ্রহনের অভিযোগ!
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার প্রধান অফিস সহকারী খালিদ হোসেনকে ঘিরে ৬০ লাখ টাকা অবৈধ ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সরকারি বিধিমালা ও প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় চলছে এক নজিরবিহীন জালিয়াতি। জানা যায় এলএ কেস নং ৬,১৮,১৯ -এর ১ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ১৩৭ টাকা ক্ষতিপূরণের অর্থ পাইয়ে দেওয়ার নামে এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকেই ৬০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে এই শাখার প্রধান সহকারী মো. খালিদ হোসাইনের বিরুদ্ধে। এই জালিয়াতির ঘটনায় আদালতে পর পর দুই দফা ফৌজদারি মামলা হয় যার প্রথমটি সিআর মামলা নং ১০১৪/২০২৬ এবং দ্বিতীয়টি সিআর মামলা নং ১০৯৯/২০২৬ মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারা উল্লেখ রয়েছে।দুটি মামলার নথি পাশাপাশি পর্যালোচনা করলে অভিযোগের ধারাবাহিকতা, অর্থ লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমের মধ্যে সম্পর্ক আরও পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পর্দার আড়ালে রহস্যজনক ‘আপস-রফাদফা’ হলেও অভিযুক্ত এই সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো বিভাগীয় বা প্রশাসনিক তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়াই তিনি এলএ শাখায় বহাল তবিয়তে তাঁর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, যা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।ঘুষের অঙ্ক ৬০ লাখ, নথিতে চেকের প্রমাণ মামলার নথি ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালীতে মেগা প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণের ১ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ১৩৭ টাকার একটি বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণের চেক পাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে মো. খালিদ হোসাইন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে বিভিন্ন ধাপে ৬০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি ও গ্রহণ করেন। মামলার নথিতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তারিখ, বিবরণ এবং তিনটি চেকের নম্বরসহ সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ আদালতে দাখিল করা হয়েছে।এই মামলার বাদী ও প্রধান ভুক্তভোগী মো. মোশারেফ সরদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,”আমার ন্যায্য ক্ষতিপূরণের ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে আমি এলএ শাখার প্রধান সহকারী খালিদ হোসাইনের খপ্পরে পড়ি। তিনি চেক পাস করানোর জন্য আমার কাছ থেকে বিভিন্ন ধাপে ৬০ লাখ টাকা ঘুষ নেন, যার সুনির্দিষ্ট চেকের প্রমাণ আমার কাছে আছে। টাকা নিয়েও তিনি দিনের পর দিন আমাকে ঘুরিয়েছেন। নিরুপায় হয়ে আমি আদালতে মামলা করতে বাধ্য হই।
“বারবার মামলা প্রত্যাহার ও রহস্যজনক আপসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন,”মামলা করার পর খালিদ ও তার প্রভাবশালী চক্র আমাকে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে নানামুখী চাপ সৃষ্টি করে। তাদের চাপের মুখে এবং টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আমি প্রথম মামলাটি তুলে নিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কথা রাখেনি। পরে দ্বিতীয়বার মামলা করলে আবারও একই কায়দায় আপসের ফাঁদ পেতে আমাকে সমঝোতা করতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি, আমি আমার টাকা পুরোপুরি ফেরত পাইনি। তারা এখন আমাকে এবং আমার পরিবারকে নানাভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
সাধারণ ক্ষতিগ্রস্তদের ভোগান্তি ও ক্ষোভ পটুয়াখালী এলএ শাখায় জমি হারিয়ে ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় থাকা আরও কয়েকজন সাধারণ ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,এখানে খালিদ হোসাইনের অনুমতি ছাড়া একটি ফাইলও নড়ে না। মেগা প্রকল্পের জন্য আমরা বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়েছি, আর সেই ক্ষতিপূরণের টাকা তুলতে এসে আমাদের পার্সেন্টেজ (ঘুষ) দিতে হচ্ছে। খালিদের বিরুদ্ধে এত বড় জালিয়াতির মামলা হওয়ার পরও তিনি কীভাবে চেয়ারে বসে থাকেন? তার খুঁটির জোর কোথায়? আমরা যারা দালালের মাধ্যমে টাকা দিতে পারি না, তাদের ফাইল মাসের পর মাস লাল ফিতায় বন্দি করে রাখা হয়।
আইন উপেক্ষা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তাদেশের প্রচলিত ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা’ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের মামলা হলে বা গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করার স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। অথচ মো. খালিদ হোসাইনের ক্ষেত্রে দুই দুইবার ফৌজদারি মামলা হওয়ার পরও জেলা প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ এলএ শাখায় বহাল রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এই রহস্যজনক নীরবতা প্রমাণ করে যে দুর্নীতির এই বিশাল অর্থের ভাগ উপরমহল পর্যন্ত পৌঁছেছে।
তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের ভিত্তিতে অতি দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ভাবমূর্তি এই ক্ষুট্টিধারী দুর্নীতিবাজদের কারণে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।
ভুক্তভোগী মোশারেফ সরদারের অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতে পৃথক দুটি মামলা দায়েরের পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নিয়ে পরিচালিত প্রাথমিক অনুসন্ধানেও অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রধান অফিস সহকারী খালিদ হোসেনের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্ষতিপূরণের অর্থ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসের সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটে।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, তিনটি চেকের মাধ্যমে মোট ৬০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে এলএ শাখার প্রধান অফিস সহকারি খালিদ হোসেনের বিরুদ্ধে। এসব আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নথি, চেক এবং ভূমি অধিগ্রহণের কাগজপত্রই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন এবং এলএ কার্যক্রমের সময়কাল পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভুক্তভোগী মোশারেফ সরদারের করা অভিযোগের সঙ্গে পাওয়া কিছু নথি ও লেনদেনের তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের পরিমাণ, চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন এবং সংশ্লিষ্ট এলএ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অনুসন্ধানে গুরুত্ব পেয়েছে।তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের পক্ষে তথ্য পাওয়া গেলেও চূড়ান্তভাবে খালিদ হোসেনের দায় নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলএ কেস নং ৬, ১৮ ও ১৯-এর নথিও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে। এসব কেসের সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে তৎকালীন সার্ভেয়ার নাজমুলের স্বাক্ষর রয়েছে বলে জানা গেছে।
সার্ভেয়ার নাজমুল বর্তমানে দশমিনা উপজেলায় বদলি হয়ে কর্মরত আছেন। সংশ্লিষ্ট সময়ে তাঁর দায়িত্ব কী ছিল, কোন পর্যায়ে তিনি নথিতে স্বাক্ষর করেছেন এবং এলএ কেসগুলোর কার্যক্রমে তাঁর ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সার্ভেয়ার নাজমুল এর বক্তব্য অনুযায়ী নথিতে স্বাক্ষর থাকার অর্থ কোনো অনিয়মে সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে না তাঁর দায়িত্ব ও নথির কার্যক্রম আলাদাভাবে যাচাই করাই হবে তদন্তের অংশ তিনি আরো বলেন এলএ কেস নাম্বার ৬, ১৮, ১৯ এর পুরো তদারকি প্রধান অফিস সহকারি খালিদ হোসেন নিজেই করেছেন এই বিষয়ে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই যদি থাকতো তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতো বলে দাবি করেন।
ভুক্তভোগী মোশারেফ সরদারের অভিযোগ, দুটি সিআর মামলা, ৬০ লাখ টাকার কথিত লেনদেন এবং এলএ কেস নং ৬, ১৮ ও ১৯-এর নথি—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের দাবি রাখে।
এই বিষয়ে খালিদ হোসেন এর কাছে জানতে চাইলে বারবার তার মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে খুব দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বিভাগীয় কমিশনার,জেলা প্রশাসক, বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হবে।


























