চৈক্ষ্যং ইউপিতে রোহিঙ্গা ভোটার অভিযোগে মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রধান করে তদন্ত টিম গঠন
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ২নং চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকটি ওয়ার্ডে রোহিঙ্গা ভোটার তালিকাভুক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রধান করে ৩ সদস্যের তদন্তটিম গঠন করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিবার অভিযোগপত্রটি পাওয়ার পর সাংবাদিকদের জানান, “এই অভিযোগের ভিত্তিতে মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্তটিম গঠন করা হবে। ইতোপূর্বে রোহিঙ্গাদের ভোটার করা নিয়ে তদন্তে সত্যতা মিলেছে। নির্বাচন অফিস কর্তৃক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা দরকার ছিল, যা তারা করেনি। ছোট খাটো শাস্তি দেওয়ার কারণে এতে কাজ হচ্ছে না।”
এর আগে স্থানীয় সচেতন মহলের পক্ষে সাংবাদিক মোঃ আমির হোসাইন ছাদেকী শনিবার আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ইউপি সদস্য, ইউপি চেয়ারম্যান এবং নির্বাচন অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ভোটার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব রোহিঙ্গা নাগরিক পূর্বে ৫-৭ বার ভোটার হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও ২০২৫ সালের ভোটার হালনাগাদে দায়িত্বশীলদের সহযোগিতায় আনুমানিক ১৫ জনের অধিক রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, প্রথমে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভিন্ন ভিন্ন নিবন্ধন কার্যালয় ব্যবহার করে জন্মস্থান, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা বান্দরবান দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন করা হয়। এরপর ইউপির উদ্যোক্তা, হিসাব সহকারী ও গ্রাম পুলিশের সহায়তায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে তথ্য সংগ্রহকারী শিক্ষক, ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অভিযোগকারী দাবি করেন, এসব রোহিঙ্গা ভোটারের নথি যাচাই করলে জন্মনিবন্ধনের নিবন্ধন কার্যালয়, নিবন্ধনের তারিখ, পিতা-মাতার নাম-ঠিকানা এবং জাতীয়তা সনদে ব্যাপক অসংগতি পাওয়া যাবে। ভোটার হওয়ার পর এদের কিছু অংশ দ্রুত পাসপোর্ট করে বিদেশে চলে গেছেন এবং কিছু অংশ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত।
এছাড়া শরণার্থী ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা স্থানীয় সর্দার, ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানের যোগসাজশে বিবাহিত স্ত্রী বা অন্য সূত্র দেখিয়ে কয়েকটি ওয়ার্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং স্থানীয়দের সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগে বলা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, তথ্য দিলে তাদের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। তারা বলেন, “আমাদের তথ্য গোপন রাখতে হবে। গোপনে তথ্য দিতে পারব কিন্তু ওপেনলি বলতে পারব না। এই চক্র ও রোহিঙ্গারা মিলে যেকোনো সময় হামলা ও হয়রানি করতে পারে।” অভিযোগে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ভোটার করা সহজ হওয়ায় স্থানীয় প্রকৃত নাগরিকদের ভোটার হতে গিয়েও হয়রানি ও টাকা দাবির শিকার হতে হচ্ছে।
অভিযোগকারী ইউএনও-এর কাছে রোহিঙ্গা ভোটার তালিকাভুক্তির সাথে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক দোষীদের শাস্তি, তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয়দের হয়রানিমুক্তভাবে ভোটার করার দাবি জানিয়েছেন। এই অভিযোগের অনুলিপি জেলা প্রশাসক, জেলা নির্বাচন অফিসার, আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঠানোর কথা উল্লেখ করেন।
সাংবাদিক মোঃ আমির হোসাইন ছাদেকী বলেন, “রোহিঙ্গা ভোটার করা এটা একটা দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ড যার জন্য স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে জনসাধারণের হয়ে দেশের স্বার্থে আমার দায়িত্ব থেকে করেছি। দেশের নিরাপত্তা ও স্থানীয় প্রকৃত ভোটারদের অধিকার রক্ষার স্বার্থে এই অনিয়মের তদন্ত হওয়া জরুরি। তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা না দিলে কেউ মুখ খুলবে না।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি কিভাবে টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা/বার্মাইয়া নাগরিকরা যাদেরকে সবাই রোহিঙ্গা/বার্মাইয়া হিসেবেই চিনে তাদেরকে ভোটার করা হচ্ছে। আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারি না। প্রশাসন যদি গোপনে তদন্ত করে তাহলে আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে।”
২নং চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন বলেন, “ওয়ার্ড মেম্বারদের শনাক্তের ভিত্তিতে তাদেরকে জাতীয়তা সনদ ও জন্ম নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। আমি অভিযোগের বিষয়টি দেখছি; প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাচন অফিসার নাহিদ শাহরিয়ার বলেন, “ভোটার তালিকা করার সময় জাতীয়তা সনদ ও জন্ম নিবন্ধন দেয় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। সুতরাং কে রোহিঙ্গা এটা শনাক্তের প্রাথমিক দায়িত্ব তাঁর। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে এনআইডি লক করে দেওয়া হবে। অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন স্থানীয় সরকার।”






















