ভর্তুকি কমাতে লাভজনক পণ্যের ব্যবসায় নামছে টিসিবি
ভর্তুকির চাপ কমাতে ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রির পাশাপাশি সাবান, ডিটারজেন্ট, চা পাতা, লবণ, আটা, ভোজ্যতেল ও মসলার মতো লাভজনক পণ্যের ব্যবসায় নামার পরিকল্পনা করছে সরকারি সংস্থাটি।
এসব পণ্য টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডধারীদের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও বিক্রি করা হবে। একই সঙ্গে নিজস্ব অর্থে পণ্য কেনা, কম সুদে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলা, পণ্যের দাম নিয়মিত সমন্বয় এবং পুরো কার্যক্রম ডিজিটাল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
টিসিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে শুরুতেই বছরে প্রায় ৯৪০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে এবং ভর্তুকি প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সংস্থাটির দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। এ পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিশন জিরো’।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ গত ১৪ জুলাই বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের কাছে এ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, ব্যবসার মডেল, তহবিল ও পণ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা গেলে ভর্তুকি কমিয়ে আনা সম্ভব। এমনকি চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তা শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, টিসিবির জরিপে দেখা গেছে, ক্রেতারা সাশ্রয়ী মূল্যে সাবান, ডিটারজেন্ট, লবণ, মসলা ও চায়ের মতো পণ্য সংস্থাটি থেকে কিনতে চান। এ কারণে বাণিজ্যিকভাবে এসব পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চার মাসে ২৮ কোটি টাকা লাভ
টিসিবির কর্মকর্তারা জানান, গত এপ্রিল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সাবান, ডিটারজেন্ট, কাপড় পরিষ্কারের সাবান ও লবণের বাণিজ্যিক বিক্রি শুরু হয়েছে। এসব পণ্য বিক্রি করে চার মাসে প্রায় ২৮ কোটি টাকা লাভ হয়েছে।
বাজারদরের তুলনায় কম দামে লাক্স ও মেরিল সাবান, হুইল ডিটারজেন্ট পাউডার, চাকা ও হুইল সাবান বিক্রি করেছে টিসিবি।
টিসিবি চেয়ারম্যান জানান, আগে টিসিবির ডিলাররা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে টাকা জমা দিতেন। সেখান থেকে টিসিবির হিসাবে টাকা আসতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগত। সম্প্রতি ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ডিলারদের সরাসরি টিসিবির হিসাবে টাকা জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে এখন সাত দিনের মধ্যেই অর্থ পাচ্ছে সংস্থাটি।
এর ফলে পণ্য কেনার জন্য ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমেছে বলে জানান তিনি। গত দুই মাসে ডাল ও চিনি কেনার জন্য কোনো ব্যাংকঋণ নেওয়া হয়নি। এতে সুদ ব্যয়ও কমেছে।
ভর্তুকি বাবদ ছাড়ের অপেক্ষায় থাকা ৬০০ কোটি টাকা পাওয়া গেলে সুদ ব্যয় ও ঋণনির্ভরতা আরও কমবে বলে জানান ফয়সল আজাদ।
এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের আওতাধীন গুদামের পরিবর্তে টিসিবির নিজস্ব গুদাম থেকে ডিলারদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে গুদাম ও পণ্য ওঠানো-নামানোর খরচ প্রায় ৬০ কোটি টাকা কমেছে। সরবরাহকারীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করায় তারা তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করছেন বলেও জানান টিসিবির কর্মকর্তারা।
বাজারের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি
বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা পণ্য টিসিবি কীভাবে বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করছে এ বিষয়ে টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, সরাসরি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য কেনার কারণে এটি সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাধারণ বিপণন ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী থেকে পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাসহ কয়েকটি ধাপ থাকে। প্রতিটি পর্যায়ে কমিশন দিতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। টিসিবির ক্ষেত্রে এসব মধ্যবর্তী ধাপ না থাকায় কম দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে।
এর ফলে লাক্স ও মেরিল সাবান ৬৫ টাকার পরিবর্তে ৪৫ টাকা, হুইল পাউডার প্রতি কেজি ৮০ টাকার পরিবর্তে ৬৫ টাকা এবং লবণ ৪০ থেকে ৪২ টাকার পরিবর্তে ৩৬ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বছরে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা
টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, নতুন পণ্যের ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা মুনাফা হতে পারে। সরকার সময়মতো ভর্তুকির অর্থ ছাড় করলে আরও ৩৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
এ ছাড়া ডিলাররা বিক্রির অর্থ সরাসরি টিসিবির হিসাবে জমা দিলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা, নিজস্ব গুদাম থেকে সরাসরি ডিলারের কাছে পণ্য সরবরাহ করলে ২০ কোটি টাকা এবং টার্নওভার কর থেকে অব্যাহতি পেলে আরও ২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব করেছে সংস্থাটি।
ভর্তুকির বড় অংশ যাচ্ছে পণ্যের দামে
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির মোট ভর্তুকির ৭৩ শতাংশ সৃষ্টি হয় ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রির কারণে। ব্যাংকঋণের সুদের কারণে ১৮ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ ভর্তুকি তৈরি হয়।
সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হয় ভোজ্যতেলে। এরপর রয়েছে মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর।
২০২২-২৩ অর্থবছরে টিসিবি ৬ হাজার ৮৫১ কোটি টাকার পণ্য ৩ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায় বিক্রি করায় ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ভর্তুকি বেড়ে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫১৪ কোটি টাকায় নেমে আসে।
অন্যদিকে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে টিসিবির সুদ বাবদ ব্যয় ছিল ৩০৯ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫৩৩ কোটি টাকা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৯৫ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৫৭ কোটি টাকা সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে।
ভবিষ্যতে গুদাম ভাড়া ও অপ্রত্যাশিত ব্যয় কমানো, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা এবং নিজস্ব গুদামের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে টিসিবির।
এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে বেসরকারি ব্যাংকে ঋণপত্র খোলা, পরিচালন কার্যক্রম পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা, প্রতি তিন মাস পর ভর্তুকি মূল্যের পণ্যের দাম সমন্বয় এবং ডিলার কমিশন পুনর্মূল্যায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
টিসিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিক্রয়কেন্দ্রে পণ্য বিক্রির আধুনিক ব্যবস্থা, উন্নত সরবরাহব্যবস্থা, আধুনিক গুদাম ব্যবস্থাপনা, পণ্যের পরিসর বাড়ানো এবং পুরো কার্যক্রম ডিজিটাল করা গেলে ভবিষ্যতে ভর্তুকি শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেনের জন্য টিসিবি বাংলা কিউআর-এর সঙ্গেও আলোচনা করছে।
বর্তমানে পাঁচ পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি
বর্তমানে টিসিবি সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর এই পাঁচটি প্রধান পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটি ২২ কোটি লিটার সয়াবিন তেল, ২ দশমিক ২ লাখ টন মসুর ডাল, ১ দশমিক ১ লাখ টন চিনি, ১৪ হাজার টন ছোলা এবং ৪ হাজার ৪০০ টন খেজুর কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে।
বর্তমানে ৬ হাজার ৪৩৮ জন ডিলারের মাধ্যমে ৭২ দশমিক ৫৪ লাখ সক্রিয় ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারের কাছে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে টিসিবির নতুন বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, টিসিবি যেন তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে না যায়, তা নিশ্চিত করে এ উদ্যোগ মূল্যায়ন করা উচিত। তার মতে, বাণিজ্যিক কার্যক্রমগুলো টিসিবির প্রধান কার্যক্রম থেকে আলাদাভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, কেউ যেন মুনাফার উদ্দেশ্যে পুনরায় বিক্রি করার জন্য টিসিবির পণ্য কিনতে না পারে, সে জন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও যথাযথ নজরদারি থাকা দরকার।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় টিসিবির ভূমিকা আরও জোরদার করার পাশাপাশি ভর্তুকির বোঝা কমানোর অন্যান্য উপায় নিয়েও সংস্থাটির ভাবা উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে সরকারের বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলো ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। তাই টিসিবির প্রস্তাবিত ব্যবসায়িক মডেল ভোক্তাদের উপকারে আসবে, নাকি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর জন্য সুযোগ তৈরি করবে তা নির্ধারণে সতর্ক যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
সূত্র : টিবিএস
























