শুল্ক বৃদ্ধির ধাক্কা, বেনাপোল দিয়ে ভারত থেকে মাছ আমদানি বন্ধের পথে
নতুন অর্থবছরে (২০২৬-২৭) মাছ আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তের চরম প্রভাব পড়েছে দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে। বাজেট কার্যকরের পর থেকেই বন্দরটি দিয়ে ভারত থেকে মাছ আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি বন্ধ বা সীমিত করেছেন। এতে বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শ্রমিক, পরিবহন খাত এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে।
শুল্কের নতুন হার ও আমদানিকারকদের দাবি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাছ আমদানির মোট শুল্কহার ৪৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করা হয়েছে। বাজেট কার্যকরের পরদিন থেকেই বেনাপোল কাস্টমস নতুন হারে শুল্ক আদায় শুরু করায় হঠাৎ করেই আমদানি থমকে দাঁড়ায়। আমদানিকারকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে বাজারে মাছের দাম অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো বাড়বে এবং সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাবে।
শুল্ক বৃদ্ধির এক নজরে হিসাব (প্রতি কেজিতে)
মিঠা পানির মাছ আগের শুল্ক ৮৬.১০ টাকা \rightarrow বর্তমান শুল্ক ১৩১.৬০ টাকা (বৃদ্ধি প্রায় ৪৬ টাকা)
সামুদ্রিক ও রুই মাছ আগের শুল্ক ৪৩.১০ টাকা \rightarrow বর্তমান শুল্ক ৬৬.১০ টাকা (বৃদ্ধি প্রায় ২৪ টাকা)
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী
২০২৫-২৬ অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১,২৯০ কোটি টাকা (সংশোধিত), কিন্তু আদায় হয়েছে ৬,৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়ায় ৪,৭৩১ কোটি টাকা (প্রায় ৪২%)। নতুন অর্থবছরে শুল্ক বৃদ্ধির কারণে আমদানি আরও কমে গেলে কাস্টমসের রাজস্ব ঘাটতি রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মাছ আমদানিকারক রহমত আলী জানান,ভারতীয় মাছের দেশে প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ব্যবসা চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লোকসান এড়াতে অনেকেই আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন।
মাছ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান,৭০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে মাছ আমদানি করে লাভ করা প্রায় অসম্ভব। প্রতি চালানে অতিরিক্ত মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকদের ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
আগে বন্দরে নিয়মিত মাছবোঝাই ট্রাক খালাসের ব্যস্ততা থাকলেও এখন দিনভর অপেক্ষা করেও ট্রাক মিলছে না। ফলে আয়-রোজগার হারিয়ে শ্রমিক ও ট্রাকচালকদের পরিবার নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি আতিকুজ্জামান সনি জানান, আগে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক মাছ আমদানি হলেও এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৪ থেকে ৫ ট্রাকে। ফলে তাঁদের বহু সদস্য এখন বেকার।
বেনাপোল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, পণ্যের প্রকৃত ওজনের বদলে ট্রাকের চাকার ওপর ভিত্তি করে শুল্কায়নের নিয়ম করায় আগেই মাছ আমদানি কমেছিল। নতুন বাজেটে অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত হওয়ায় সংকট এখন চরম রূপ নিয়েছে।
মৎস্য নিয়ন্ত্রণ দপ্তর পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম জানান, গত অর্থবছরেই আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন মাছ কম এসেছিল। বর্তমান শুল্ক কাঠামোর কারণে চলতি বছরে আমদানি তলানিতে ঠেকবে।
কাস্টমস সহকারী কমিশনার মুক্তা চৌধুরী জানান, গত অর্থবছরে এ বন্দর দিয়ে ১ কোটি ২৬ লাখ ৭ টন মিঠা পানির মাছ এবং ৭৪ লাখ ৮১ টন সামুদ্রিক মাছ আমদানি হয়েছিল। তবে নতুন বাজেট কার্যকরের পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৩৮৬ টন মিঠা পানির মাছ এবং ১৯৪ টন সামুদ্রিক মাছ আমদানি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, মাছের ওপর অতিরিক্ত শুল্কের এ সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং রাজস্ব আয়—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশের সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ ও বন্দরের ব্যবসায়িক পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে সরকার দ্রুত এ বর্ধিত শুল্ক পুনর্বিবেচনা করবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
জয়নাল আবেদীন
বেনাপোল প্রতিনিধি




















