1. admin@kagojerbarta.com : admin :
  2. kamrul304076@gmail.com : Kamrul :
  3. jamalpurbakshiganj@gmail.com : Kamrulbk :
  4. seyam2858@gmail.com : seyam :
ঢাকা ১২:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নৌকায় ভাসছে পেয়ারা, জমজমাট নেছারাবাদের ভাসমান হাট

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

খালজুড়ে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকায় সাজানো তাজা সবুজ-হলুদ পেয়ারা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, খালের বুকে যেন ভেসে চলেছে সবুজ-হলুদের ক্যানভাস। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানায় পেয়ারার ভরা মৌসুমে এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মেলে।

সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আটঘর কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠিসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের খাল চিরে ছোট ছোট নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসেন চাষিরা। সন্ধ্যা নদীর শাখা আটঘর কুড়িয়ানা খাল ঘিরে গড়ে ওঠা দেশের একমাত্র ভাসমান পেয়ারার হাট এখন শুধু স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র নয়, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও অনন্য এক দর্শনীয় স্থান।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পেয়ারা আকারে বড় ও সুস্বাদু হওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর নেছারাবাদের পেয়ারার বাজার আরও বিস্তৃত হয়েছে। এতে কৃষকরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন এবং ব্যবসায়ীরাও দ্রুত পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারছেন। এর ফলে পেয়ারার চাষ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

পেয়ারার মৌসুমে এই হাটকে ঘিরে পর্যটকদেরও ব্যাপক সমাগম ঘটে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে ভাসমান হাট। দর্শনার্থীরা নৌকা ও ট্রলারে করে পেয়ারা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি এসেছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

রোববার আটঘর কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাট ঘুরে দেখা যায়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় পেয়ারা নিয়ে এসেছেন চাষিরা। পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চলছে দরদাম। দাম মিলে গেলে প্লাস্টিকের ট্রেতে তুলে নেওয়া হচ্ছে পেয়ারা। কেউ পেয়ারা বিক্রি করে টাকা নিয়ে ফিরছেন, আবার কেউ পরিবারের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছেন।

এই হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র। পর্যটকদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোও। এসব খাবারের দোকানে সরষে ইলিশ, ইলিশভর্তা, চিংড়ি ভুনা ও হাঁসের মাংসসহ বিভিন্ন দেশীয় খাবার পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

পেয়ারাচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিদিন এই হাট থেকে শত শত মণ পেয়ারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মণ পেয়ারা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাগেরহাটের কচুয়া থেকে পেয়ারা কিনতে আসা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কচুয়া উপজেলা থেকে এসেছি। এখান থেকে পেয়ারা কিনে বাজারে বিক্রি করব। এই পেয়ারা বাংলাদেশে আর কোথাও হয় না।’

স্থানীয় পেয়ারা ব্যবসায়ী মোস্তফা হাওলাদার বলেন, ‘এ বছর আবহাওয়া খারাপ থাকায় পেয়ারা কিছুটা কম হয়েছে। তবে দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে।’

পেয়ারাচাষি অনুপম হালদার বলেন, ‘আমার ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। ফজরের আজানের পর বাগানে গিয়ে পেয়ারা পাড়া শুরু করি। পেয়ারা পাড়তে অনেক সময় লাগে। পাড়া শেষ হলে নৌকায় করে হাটে বিক্রি করতে নিয়ে আসি।’

পিরোজপুর থেকে ভাসমান পেয়ারা হাট দেখতে আসা পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার কিঞ্জাল বলেন, ‘প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে ভাসমান পেয়ারা হাট দেখতে আসি। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। ছোট ছোট নৌকায় করে খালের ভেতর দিয়ে পেয়ারা নিয়ে আসার দৃশ্য অসাধারণ। এরকম সৌন্দর্য আর কোথাও দেখা যায় না।’

নেছারাবাদের ইউএনও অমিত দত্ত বলেন, উপজেলার পুরো পর্যটনব্যবস্থা নিয়ে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। কীভাবে এই পর্যটনকেন্দ্রকে আরও আকর্ষণীয় করা যায় এবং পর্যটকদের থাকা, খাওয়া ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামারবাড়ী) সৌমিত্র সরকার বলেন, পিরোজপুর জেলার মধ্যে নেছারাবাদেই সবচেয়ে বেশি পেয়ারা চাষ হয়। জেলায় প্রায় ৭১০ হেক্টর জমিতে এই ফলের আবাদ হচ্ছে। উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ২১০ মেট্রিক টন। প্রতি মৌসুমে আটঘর কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাটে ২০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের পেয়ারা কেনাবেচা হয়।

তিনি বলেন, এখানে একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে মৌসুমে উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হবে। এতে কৃষকরা মৌসুমের বাইরে ন্যায্য বাজারমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

সবুজ-হলুদ পেয়ারাভর্তি সারি সারি নৌকা, খালের স্বচ্ছ পানিতে ভেসে চলা বেচাকেনা আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি—সব মিলিয়ে আটঘর কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাট এখন কৃষি, বাণিজ্য ও পর্যটনের এক অনন্য মিলনস্থল। স্থানীয়দের আশা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন অবকাঠামোর আরও উন্নয়ন হলে এই ভাসমান হাট দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আরও পরিচিতি পাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ০৪:৩০:৫১ পূর্বাহ্ণ, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

নৌকায় ভাসছে পেয়ারা, জমজমাট নেছারাবাদের ভাসমান হাট

আপডেট সময় : ০৪:৩০:৫১ পূর্বাহ্ণ, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

খালজুড়ে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকায় সাজানো তাজা সবুজ-হলুদ পেয়ারা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, খালের বুকে যেন ভেসে চলেছে সবুজ-হলুদের ক্যানভাস। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানায় পেয়ারার ভরা মৌসুমে এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মেলে।

সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আটঘর কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠিসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের খাল চিরে ছোট ছোট নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসেন চাষিরা। সন্ধ্যা নদীর শাখা আটঘর কুড়িয়ানা খাল ঘিরে গড়ে ওঠা দেশের একমাত্র ভাসমান পেয়ারার হাট এখন শুধু স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র নয়, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও অনন্য এক দর্শনীয় স্থান।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পেয়ারা আকারে বড় ও সুস্বাদু হওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর নেছারাবাদের পেয়ারার বাজার আরও বিস্তৃত হয়েছে। এতে কৃষকরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন এবং ব্যবসায়ীরাও দ্রুত পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারছেন। এর ফলে পেয়ারার চাষ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

পেয়ারার মৌসুমে এই হাটকে ঘিরে পর্যটকদেরও ব্যাপক সমাগম ঘটে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে ভাসমান হাট। দর্শনার্থীরা নৌকা ও ট্রলারে করে পেয়ারা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি এসেছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

রোববার আটঘর কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাট ঘুরে দেখা যায়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় পেয়ারা নিয়ে এসেছেন চাষিরা। পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চলছে দরদাম। দাম মিলে গেলে প্লাস্টিকের ট্রেতে তুলে নেওয়া হচ্ছে পেয়ারা। কেউ পেয়ারা বিক্রি করে টাকা নিয়ে ফিরছেন, আবার কেউ পরিবারের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছেন।

এই হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র। পর্যটকদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোও। এসব খাবারের দোকানে সরষে ইলিশ, ইলিশভর্তা, চিংড়ি ভুনা ও হাঁসের মাংসসহ বিভিন্ন দেশীয় খাবার পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

পেয়ারাচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিদিন এই হাট থেকে শত শত মণ পেয়ারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মণ পেয়ারা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাগেরহাটের কচুয়া থেকে পেয়ারা কিনতে আসা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কচুয়া উপজেলা থেকে এসেছি। এখান থেকে পেয়ারা কিনে বাজারে বিক্রি করব। এই পেয়ারা বাংলাদেশে আর কোথাও হয় না।’

স্থানীয় পেয়ারা ব্যবসায়ী মোস্তফা হাওলাদার বলেন, ‘এ বছর আবহাওয়া খারাপ থাকায় পেয়ারা কিছুটা কম হয়েছে। তবে দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে।’

পেয়ারাচাষি অনুপম হালদার বলেন, ‘আমার ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। ফজরের আজানের পর বাগানে গিয়ে পেয়ারা পাড়া শুরু করি। পেয়ারা পাড়তে অনেক সময় লাগে। পাড়া শেষ হলে নৌকায় করে হাটে বিক্রি করতে নিয়ে আসি।’

পিরোজপুর থেকে ভাসমান পেয়ারা হাট দেখতে আসা পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার কিঞ্জাল বলেন, ‘প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে ভাসমান পেয়ারা হাট দেখতে আসি। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। ছোট ছোট নৌকায় করে খালের ভেতর দিয়ে পেয়ারা নিয়ে আসার দৃশ্য অসাধারণ। এরকম সৌন্দর্য আর কোথাও দেখা যায় না।’

নেছারাবাদের ইউএনও অমিত দত্ত বলেন, উপজেলার পুরো পর্যটনব্যবস্থা নিয়ে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। কীভাবে এই পর্যটনকেন্দ্রকে আরও আকর্ষণীয় করা যায় এবং পর্যটকদের থাকা, খাওয়া ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামারবাড়ী) সৌমিত্র সরকার বলেন, পিরোজপুর জেলার মধ্যে নেছারাবাদেই সবচেয়ে বেশি পেয়ারা চাষ হয়। জেলায় প্রায় ৭১০ হেক্টর জমিতে এই ফলের আবাদ হচ্ছে। উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ২১০ মেট্রিক টন। প্রতি মৌসুমে আটঘর কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাটে ২০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের পেয়ারা কেনাবেচা হয়।

তিনি বলেন, এখানে একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে মৌসুমে উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হবে। এতে কৃষকরা মৌসুমের বাইরে ন্যায্য বাজারমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

সবুজ-হলুদ পেয়ারাভর্তি সারি সারি নৌকা, খালের স্বচ্ছ পানিতে ভেসে চলা বেচাকেনা আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি—সব মিলিয়ে আটঘর কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাট এখন কৃষি, বাণিজ্য ও পর্যটনের এক অনন্য মিলনস্থল। স্থানীয়দের আশা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন অবকাঠামোর আরও উন্নয়ন হলে এই ভাসমান হাট দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আরও পরিচিতি পাবে।