1. admin@kagojerbarta.com : admin :
  2. kamrul304076@gmail.com : Kamrul :
  3. jamalpurbakshiganj@gmail.com : Kamrulbk :
  4. seyam2858@gmail.com : seyam :
ঢাকা ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে হাত দিয়ে ঠিকমতো লেখা যায় না, সেই হাতেই ভবিষ্যৎ লিখছে সিনহা

মো. এ কে নোমান, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
৪৮

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন এক স্বপ্নবাজ তরুণের

বেলা গড়িয়ে দুপুর। নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় শিফটের ক্লাস শুরু হতে আর কয়েক মিনিট বাকি। ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত পদচারণা। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মশগুল, কেউ ক্যান্টিনে শেষ মুহূর্তের আড্ডায়, আবার কেউ তাড়াহুড়ো করে শ্রেণিকক্ষের দিকে ছুটছেন। সেই ব্যস্ততার মাঝেই ধীরে ধীরে করিডোর ধরে এগিয়ে আসেন এক তরুণ। পাশে নির্ভরতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এক সহপাঠী, আরেকজন কাঁধে তুলে নিয়েছেন তার ব্যাগ। প্রতিটি পদক্ষেপে শারীরিক সীমাবদ্ধতার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু মুখে নেই কোনো আক্ষেপ কিংবা অসহায়ত্ব। বরং চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক অদম্য আত্মবিশ্বাস-যে আত্মবিশ্বাস বলে, স্বপ্নের কাছে কোনো প্রতিবন্ধকতাই শেষ কথা নয়।

শ্রেণিকক্ষে ঢুকেই নির্দিষ্ট আসনে বসেন তিনি। ব্যাগ থেকে বের করেন ল্যাপটপ। মুহূর্তের মধ্যেই আঙুল ছুটতে শুরু করে কিবোর্ডের ওপর। যে হাত দিয়ে দীর্ঘক্ষণ কলম ধরা কষ্টকর, সেই হাতই সাবলীলভাবে লিখতে থাকে প্রোগ্রামিং কোড। ক্লাসে তখনও অনেক শিক্ষার্থী আসেননি। কিন্তু তার শেখার ক্লাস যেন শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।

এই তরুণের নাম নিশাদ আনান সিনহা। নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের তৃতীয় পর্বের শিক্ষার্থী। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না, স্পষ্ট করে কথা বলতেও কষ্ট হয়, দীর্ঘ সময় ধরে লিখতেও পারেন না। কিন্তু জীবনের এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে তিনি কখনো পরাজয় হিসেবে মেনে নেননি। বরং প্রতিটি প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছেন একজন দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং ভবিষ্যতের সফটওয়্যার ডেভেলপার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।

ক্লাসে শিক্ষক থাকুন কিংবা না থাকুন, সিনহার উপস্থিতি যেন অবধারিত। অনেক সময় ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই তিনি এসে বসে পড়েন। কখনো বই পড়েন, কখনো ল্যাপটপে কোড লেখেন, আবার কখনো নতুন কোনো প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থী যখন সময় কাটান আড্ডায় কিংবা অমনোযোগে, তখন সিনহা প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগান নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে। সহপাঠীদের ভাষায়, “ক্লাসে নিয়মিত আসাটাই যেন সিনহার নেশা।”

জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বেলখুর গ্রামের বাসিন্দা নিশাদ আনান সিনহা। বাবা মো. মাসুদ ইবনে কামাল ও মা মোছা. শান্তনা খাতুন। জন্মের পর থেকেই পরিবার বুঝতে পারে, সন্তানের জীবন অন্যদের মতো সহজ হবে না। কিন্তু পরিবার যেমন তাকে সাহস জুগিয়েছে, তেমনি সিনহাও কখনো নিজের ভাগ্যকে দোষ দেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষকে বড় করে তার শরীর নয়, তার ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং কর্মদক্ষতা।

শৈশব থেকেই প্রযুক্তির প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা। বাড়িতে একটি কম্পিউটার থাকায় সুযোগ পেলেই সেটি নিয়ে বসে পড়তেন। বাবা ও চাচাদের কম্পিউটার ব্যবহার করতে দেখে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। ২০২১ সালে বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার পর সেই আগ্রহ রূপ নেয় শেখার নেশায়। ইউটিউবই হয়ে ওঠে তার শিক্ষক। কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, কোনো ব্যয়বহুল কোর্স নয়-নিজের আগ্রহ, ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের ওপর ভর করেই তিনি শিখতে শুরু করেন কম্পিউটার, ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এবং প্রোগ্রামিং।

২০২৪ সালে নিকড়দীঘি নান্দুলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৪.৬৮ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর নিজের স্বপ্নের পথেই হাঁটেন। ভর্তি হন নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে। বর্তমানে তিনি তৃতীয় পর্বের শিক্ষার্থী।

পড়াশোনার সুবিধার্থে ইনস্টিটিউটের পাশের একটি মেসে থাকেন সিনহা। প্রতিদিন ক্লাসে যাওয়াটাও তার জন্য এক ধরনের সংগ্রাম। অনেক সময় সহপাঠীরা হাত ধরে তাকে মেস থেকে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে আসেন। ক্লাস শেষে আবার পৌঁছে দেন মেসে। বাজার করা, প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা কিংবা বাইরে কোথাও যাওয়ার ক্ষেত্রেও বন্ধুরাই তার সবচেয়ে বড় ভরসা। এই বন্ধুত্ব আর সহযোগিতাই প্রতিদিন তাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়।

তবে এই সহযোগিতা কখনো একমুখী নয়। পড়াশোনার ক্ষেত্রে অনেক সময় উল্টো সিনহাই হয়ে ওঠেন বন্ধুদের ভরসা। বিশেষ করে প্রোগ্রামিংয়ের কোনো জটিল সমস্যা দেখা দিলে সহপাঠীরা ছুটে যান তার কাছেই। ব্যবহারিক ক্লাসে তার দক্ষতা শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবারই প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইতোমধ্যে ওয়ার্ডপ্রেস ব্যবহার করে নিজের একটি পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন। পাশাপাশি ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের বেশ কয়েকটি ছোট প্রকল্পও সম্পন্ন করেছেন।

নিশাদ আনান সিনহা বলেন, “আমি ইউটিউব দেখে দেখে বিভিন্ন ধরনের কাজ শিখেছি। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল। ২০২১ সালে বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার পর নিয়মিত শেখা শুরু করি। এরপর প্রোগ্রামিং, ডিজাইনিং ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করছি। কয়েকটি প্রজেক্ট শেষ করেছি। প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করি। কারণ শেখার কোনো শেষ নেই।”

স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠে ভেসে ওঠে দৃঢ়তা। তিনি বলেন, “আমার অনেক কিছু শেখার ইচ্ছা আছে। কিন্তু সব সময় সুযোগ পাই না। কোনো আইটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যদি বাস্তব কাজ শেখার সুযোগ দেন কিংবা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন, তাহলে আমি আরও দক্ষ হতে পারব। আমার স্বপ্ন একজন দক্ষ ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার হওয়া। আমি চাই, মানুষ আমার প্রতিবন্ধকতাকে নয়, আমার কাজকে মনে রাখুক।”

সহপাঠীরা বলেন, “সিনহা আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার আরেক নাম। আমরা তাকে কখনো করুণা করি না; বরং তাকে নিয়ে গর্ব করি। ক্লাসে যাওয়া-আসায় আমরা সহযোগিতা করি ঠিকই, কিন্তু প্রোগ্রামিংয়ে কোনো সমস্যা হলে আমরা ওর কাছেই যাই। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাকে কখনো হতাশ হতে দেখিনি। সব সময় হাসিমুখে থাকে, নতুন কিছু শেখে এবং অন্যদেরও শেখায়।”

নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ মো. নাসিমুজ্জামান বলেন, “নিশাদ আনান সিনহা অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র ও পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সে কখনো সেটিকে অজুহাত বানায়নি। নিয়মিত ক্লাস করে, ব্যবহারিক কাজে অংশ নেয় এবং নতুন প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ ধরে রেখেছে। বিশেষ করে প্রোগ্রামিংয়ে তার দক্ষতা সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমান সময়ে যখন অনেক তরুণ বিপথে যাচ্ছে, তখন সিনহা নিজেকে মাদকসহ সব ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে তথ্যপ্রযুক্তি শেখায় মনোনিবেশ করেছে। সে অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি ইতিবাচক উদাহরণ।”

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় শিফটের বিভাগীয় প্রধান মো. মিজানুর রহমান বলেন, “সিনহার গল্প প্রমাণ করে, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইচ্ছাশক্তি। প্রতিদিন নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করেও সে নিয়মিত ক্লাস করছে, ল্যাবে কাজ করছে এবং নিজেকে দক্ষ করে তুলছে। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি এমন মেধাবী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তারা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।”

শিক্ষকদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, দক্ষতাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই সঠিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এবং কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা পেলে সিনহার মতো তরুণরা শুধু নিজেদের জীবনই বদলাবেন না, দেশের প্রযুক্তি খাতকেও সমৃদ্ধ করবেন।

প্রতিদিন যখন সহপাঠীদের হাত ধরে ধীরে ধীরে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন নিশাদ আনান সিনহা, তখন হয়তো অনেকেই একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে দেখেন। কিন্তু যারা তাকে কাছ থেকে চেনেন, তারা দেখেন এক অদম্য স্বপ্নবাজকে। যে হাত দিয়ে সুন্দর করে লেখা যায় না, সেই হাতই আজ প্রযুক্তির ভাষায় নিজের ভবিষ্যৎ লিখছে। যে পায়ে দ্রুত হাঁটা যায় না, সেই পায়েই তিনি এগিয়ে চলেছেন সাফল্যের পথে।

নিশাদ আনান সিনহার গল্প কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায়, বন্ধুত্ব, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক জীবন্ত দলিল। কারণ, প্রতিবন্ধকতা কোনো মানুষের পরিচয় নয়-পরিচয় তার মেধা, পরিশ্রম এবং স্বপ্ন পূরণের সাহস।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ০২:৪৪:৪৯ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬ ৪৪ বার পড়া হয়েছে

যে হাত দিয়ে ঠিকমতো লেখা যায় না, সেই হাতেই ভবিষ্যৎ লিখছে সিনহা

আপডেট সময় : ০২:৪৪:৪৯ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬
৪৮

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন এক স্বপ্নবাজ তরুণের

বেলা গড়িয়ে দুপুর। নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় শিফটের ক্লাস শুরু হতে আর কয়েক মিনিট বাকি। ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত পদচারণা। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মশগুল, কেউ ক্যান্টিনে শেষ মুহূর্তের আড্ডায়, আবার কেউ তাড়াহুড়ো করে শ্রেণিকক্ষের দিকে ছুটছেন। সেই ব্যস্ততার মাঝেই ধীরে ধীরে করিডোর ধরে এগিয়ে আসেন এক তরুণ। পাশে নির্ভরতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এক সহপাঠী, আরেকজন কাঁধে তুলে নিয়েছেন তার ব্যাগ। প্রতিটি পদক্ষেপে শারীরিক সীমাবদ্ধতার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু মুখে নেই কোনো আক্ষেপ কিংবা অসহায়ত্ব। বরং চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক অদম্য আত্মবিশ্বাস-যে আত্মবিশ্বাস বলে, স্বপ্নের কাছে কোনো প্রতিবন্ধকতাই শেষ কথা নয়।

শ্রেণিকক্ষে ঢুকেই নির্দিষ্ট আসনে বসেন তিনি। ব্যাগ থেকে বের করেন ল্যাপটপ। মুহূর্তের মধ্যেই আঙুল ছুটতে শুরু করে কিবোর্ডের ওপর। যে হাত দিয়ে দীর্ঘক্ষণ কলম ধরা কষ্টকর, সেই হাতই সাবলীলভাবে লিখতে থাকে প্রোগ্রামিং কোড। ক্লাসে তখনও অনেক শিক্ষার্থী আসেননি। কিন্তু তার শেখার ক্লাস যেন শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।

এই তরুণের নাম নিশাদ আনান সিনহা। নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের তৃতীয় পর্বের শিক্ষার্থী। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না, স্পষ্ট করে কথা বলতেও কষ্ট হয়, দীর্ঘ সময় ধরে লিখতেও পারেন না। কিন্তু জীবনের এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে তিনি কখনো পরাজয় হিসেবে মেনে নেননি। বরং প্রতিটি প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছেন একজন দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং ভবিষ্যতের সফটওয়্যার ডেভেলপার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।

ক্লাসে শিক্ষক থাকুন কিংবা না থাকুন, সিনহার উপস্থিতি যেন অবধারিত। অনেক সময় ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই তিনি এসে বসে পড়েন। কখনো বই পড়েন, কখনো ল্যাপটপে কোড লেখেন, আবার কখনো নতুন কোনো প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থী যখন সময় কাটান আড্ডায় কিংবা অমনোযোগে, তখন সিনহা প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগান নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে। সহপাঠীদের ভাষায়, “ক্লাসে নিয়মিত আসাটাই যেন সিনহার নেশা।”

জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বেলখুর গ্রামের বাসিন্দা নিশাদ আনান সিনহা। বাবা মো. মাসুদ ইবনে কামাল ও মা মোছা. শান্তনা খাতুন। জন্মের পর থেকেই পরিবার বুঝতে পারে, সন্তানের জীবন অন্যদের মতো সহজ হবে না। কিন্তু পরিবার যেমন তাকে সাহস জুগিয়েছে, তেমনি সিনহাও কখনো নিজের ভাগ্যকে দোষ দেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষকে বড় করে তার শরীর নয়, তার ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং কর্মদক্ষতা।

শৈশব থেকেই প্রযুক্তির প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা। বাড়িতে একটি কম্পিউটার থাকায় সুযোগ পেলেই সেটি নিয়ে বসে পড়তেন। বাবা ও চাচাদের কম্পিউটার ব্যবহার করতে দেখে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। ২০২১ সালে বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার পর সেই আগ্রহ রূপ নেয় শেখার নেশায়। ইউটিউবই হয়ে ওঠে তার শিক্ষক। কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, কোনো ব্যয়বহুল কোর্স নয়-নিজের আগ্রহ, ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের ওপর ভর করেই তিনি শিখতে শুরু করেন কম্পিউটার, ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এবং প্রোগ্রামিং।

২০২৪ সালে নিকড়দীঘি নান্দুলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৪.৬৮ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর নিজের স্বপ্নের পথেই হাঁটেন। ভর্তি হন নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে। বর্তমানে তিনি তৃতীয় পর্বের শিক্ষার্থী।

পড়াশোনার সুবিধার্থে ইনস্টিটিউটের পাশের একটি মেসে থাকেন সিনহা। প্রতিদিন ক্লাসে যাওয়াটাও তার জন্য এক ধরনের সংগ্রাম। অনেক সময় সহপাঠীরা হাত ধরে তাকে মেস থেকে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে আসেন। ক্লাস শেষে আবার পৌঁছে দেন মেসে। বাজার করা, প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা কিংবা বাইরে কোথাও যাওয়ার ক্ষেত্রেও বন্ধুরাই তার সবচেয়ে বড় ভরসা। এই বন্ধুত্ব আর সহযোগিতাই প্রতিদিন তাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়।

তবে এই সহযোগিতা কখনো একমুখী নয়। পড়াশোনার ক্ষেত্রে অনেক সময় উল্টো সিনহাই হয়ে ওঠেন বন্ধুদের ভরসা। বিশেষ করে প্রোগ্রামিংয়ের কোনো জটিল সমস্যা দেখা দিলে সহপাঠীরা ছুটে যান তার কাছেই। ব্যবহারিক ক্লাসে তার দক্ষতা শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবারই প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইতোমধ্যে ওয়ার্ডপ্রেস ব্যবহার করে নিজের একটি পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন। পাশাপাশি ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের বেশ কয়েকটি ছোট প্রকল্পও সম্পন্ন করেছেন।

নিশাদ আনান সিনহা বলেন, “আমি ইউটিউব দেখে দেখে বিভিন্ন ধরনের কাজ শিখেছি। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল। ২০২১ সালে বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার পর নিয়মিত শেখা শুরু করি। এরপর প্রোগ্রামিং, ডিজাইনিং ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করছি। কয়েকটি প্রজেক্ট শেষ করেছি। প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করি। কারণ শেখার কোনো শেষ নেই।”

স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠে ভেসে ওঠে দৃঢ়তা। তিনি বলেন, “আমার অনেক কিছু শেখার ইচ্ছা আছে। কিন্তু সব সময় সুযোগ পাই না। কোনো আইটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যদি বাস্তব কাজ শেখার সুযোগ দেন কিংবা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন, তাহলে আমি আরও দক্ষ হতে পারব। আমার স্বপ্ন একজন দক্ষ ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার হওয়া। আমি চাই, মানুষ আমার প্রতিবন্ধকতাকে নয়, আমার কাজকে মনে রাখুক।”

সহপাঠীরা বলেন, “সিনহা আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার আরেক নাম। আমরা তাকে কখনো করুণা করি না; বরং তাকে নিয়ে গর্ব করি। ক্লাসে যাওয়া-আসায় আমরা সহযোগিতা করি ঠিকই, কিন্তু প্রোগ্রামিংয়ে কোনো সমস্যা হলে আমরা ওর কাছেই যাই। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাকে কখনো হতাশ হতে দেখিনি। সব সময় হাসিমুখে থাকে, নতুন কিছু শেখে এবং অন্যদেরও শেখায়।”

নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ মো. নাসিমুজ্জামান বলেন, “নিশাদ আনান সিনহা অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র ও পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সে কখনো সেটিকে অজুহাত বানায়নি। নিয়মিত ক্লাস করে, ব্যবহারিক কাজে অংশ নেয় এবং নতুন প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ ধরে রেখেছে। বিশেষ করে প্রোগ্রামিংয়ে তার দক্ষতা সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমান সময়ে যখন অনেক তরুণ বিপথে যাচ্ছে, তখন সিনহা নিজেকে মাদকসহ সব ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে তথ্যপ্রযুক্তি শেখায় মনোনিবেশ করেছে। সে অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি ইতিবাচক উদাহরণ।”

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় শিফটের বিভাগীয় প্রধান মো. মিজানুর রহমান বলেন, “সিনহার গল্প প্রমাণ করে, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইচ্ছাশক্তি। প্রতিদিন নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করেও সে নিয়মিত ক্লাস করছে, ল্যাবে কাজ করছে এবং নিজেকে দক্ষ করে তুলছে। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি এমন মেধাবী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তারা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।”

শিক্ষকদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, দক্ষতাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই সঠিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এবং কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা পেলে সিনহার মতো তরুণরা শুধু নিজেদের জীবনই বদলাবেন না, দেশের প্রযুক্তি খাতকেও সমৃদ্ধ করবেন।

প্রতিদিন যখন সহপাঠীদের হাত ধরে ধীরে ধীরে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন নিশাদ আনান সিনহা, তখন হয়তো অনেকেই একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে দেখেন। কিন্তু যারা তাকে কাছ থেকে চেনেন, তারা দেখেন এক অদম্য স্বপ্নবাজকে। যে হাত দিয়ে সুন্দর করে লেখা যায় না, সেই হাতই আজ প্রযুক্তির ভাষায় নিজের ভবিষ্যৎ লিখছে। যে পায়ে দ্রুত হাঁটা যায় না, সেই পায়েই তিনি এগিয়ে চলেছেন সাফল্যের পথে।

নিশাদ আনান সিনহার গল্প কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায়, বন্ধুত্ব, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক জীবন্ত দলিল। কারণ, প্রতিবন্ধকতা কোনো মানুষের পরিচয় নয়-পরিচয় তার মেধা, পরিশ্রম এবং স্বপ্ন পূরণের সাহস।