গ্রামভিত্তিক পণ্য নিয়ে খুলছে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন দুয়ার
গ্রামভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আধুনিক নকশা ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিকভাবে শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁত, মৃৎশিল্প ও বুনন শিল্প—এই পাঁচ ধরনের পণ্য নিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ধাপে ধাপে প্রতিটি গ্রামের সম্ভাবনাময় একটি পণ্যকে ব্র্যান্ডে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামেই প্রায় ৭৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় ডিজাইনারদের সমন্বয়ে গঠন করা হবে ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’। পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে গড়ে তোলা হবে ‘সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব’। ভবিষ্যতে এই হাবকে কেন্দ্র করে একটি সাংস্কৃতিক জেলাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির জন্য সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশি-বিদেশি কয়েকটি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানও এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
অর্থ বিভাগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিসংক্রান্ত এক সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, সরকারের লক্ষ্য বাংলাদেশের জিডিপিতে ক্রিয়েটিভ শিল্পের অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা। এর অংশ হিসেবে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ড চালু, আন্তর্জাতিক মানের ফিল্ম স্টুডিও স্থাপন, ওটিটি খাতের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সৃজনশীল পণ্য তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব, দেশীয় ডিজাইনারদের নিয়ে ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আঞ্চলিক ক্রিয়েটিভ হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধি ছাড়াও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
পাঁচ পণ্য দিয়ে পাইলট প্রকল্প
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভায় শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প ও বুনন শিল্পসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্যের কথা উঠে আসে। সভায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, গত এক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোন এলাকার কোন পণ্যকে কীভাবে ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাত করা যায়, সে বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়েই কাজ করতে হবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ কর্মসূচির আওতায় কারা এবং কীভাবে সহায়তা পাবেন, তার সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ভারসাম্য ও সব শ্রেণির মানুষকে কর্মসূচির আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ জানান, বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় কোন ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্র্যাক ৩৩-৩৪টি ওরিয়েন্টেশন কর্মশালা করেছে।
উৎপাদন থেকে বিপণন—বাড়বে কর্মসংস্থান
ব্র্যাকের হিসাবে, ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৭৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই কর্মসংস্থান শুধু কারিগর বা উদ্যোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহণ, বিপণন ও রপ্তানি—পুরো সরবরাহব্যবস্থাজুড়েই নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
উৎপাদন খাতে তাঁতি, কারুশিল্পী, মৃৎশিল্পী, বাঁশ-বেতশিল্পী, কৃষক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারীদের কাজ বাড়বে। পাশাপাশি প্যাকেজিং, লেবেলিং, মান নিয়ন্ত্রণ, ডিজাইন, পরিবহণ, গুদামজাতকরণ ও ডেলিভারি খাতেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, বাজারসংযোগ ও রপ্তানি সহায়তার ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিবি রাসেলের নেতৃত্বে ডিজাইনার পুল
গ্রামীণ পণ্যের আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে দেশীয় খ্যাতিমান ডিজাইনারদের সমন্বয়ে ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলকে যুক্ত করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এ পুল গঠনের জন্য সভা আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর মাধ্যমে স্থানীয় কারুশিল্পীদের সঙ্গে পেশাদার ডিজাইনারদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জব্বারের বলীখেলা, বনবিবি উৎসবের মতো স্থানীয় ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো তৈরি করলেই ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি সফল হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে প্রয়োজন মানসম্মত কাঁচামাল, আধুনিক ডিজাইন, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, ই-কমার্স সুবিধা, ব্যাংক ঋণ, কপিরাইট ও জিআই সুরক্ষা, মান সনদ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শুধু অবকাঠামো তৈরি করে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। এর জন্য কার্যকর নীতি ও টেকসই ব্যবস্থাপনার ইকোসিস্টেম প্রয়োজন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে আত্মকর্মসংস্থানে। কনটেন্ট নির্মাতা ও ফ্রিল্যান্সাররা ইতোমধ্যে স্টার্টআপ ও নতুন উদ্যোগ তৈরি করছেন। তাদের উৎসাহ দেওয়া গেলে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বড় ধরনের আত্মকর্মসংস্থানের উৎস হতে পারে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিতে বরাদ্দের আকারের চেয়ে অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তার বিপরীতে কতটা উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বাজার তৈরি হচ্ছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।






















