আসিফ মাহমুদের দায়িত্বকালের নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতির নথি দুদকে
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৌঁছেছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর নথিপত্র তলব করে দুদক চিঠি দেওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে এসব কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুদকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের ওই কর্মকর্তা বলেন, অনুসন্ধানের স্বার্থে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে নথিপত্র তলব করা হয়েছিল। অধিকাংশ নথি পাওয়া গেছে। এখন এসব নথি যাচাই-বাছাই করে আইন ও বিধির কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা দেখা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হবে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ অনুসন্ধানে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে বিশেষ টিম গঠন করা হয়।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পরদিন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে চার ধরনের নথি চেয়ে চিঠি দেয় দুদক। এর মধ্যে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত নথি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকমূলে বদলি সংক্রান্ত নথিপত্রও রয়েছে।
এদিকে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন এবং অর্থ পাচারসহ নতুন একাধিক অভিযোগের বিষয়েও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। এসব অভিযোগ আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে সংযুক্ত করে তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। নতুন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে অনুসন্ধান করা হবে।
নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের টেন্ডার এবং বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে পাঁচটি দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পর্তুগালে দুর্নীতির অর্থ দিয়ে জমি কেনার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের বিষয়ে সরকারের নিজেদের মধ্যেই আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তার দাবি, বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে।
দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদ ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান আসিফ মাহমুদ। পরে গত ১০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে আইনি নোটিশও দেন তিনি।
তবে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান চলছে।



























