ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার
লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিন
জিওপলিটিক্স বা ভূ-রাজনীতি বড়ই অদ্ভুত এক বিষয়। বিশ্ব রাজনীতিতে এ ভুমিকা ব্যাপক। মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ নিকোলাস স্পাইকম্যান বলেছেন, “Geography is the most fundamental factor in foreign policy because it is the most permanent.” অর্থাৎ ভূগোল পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে মৌলিক উপাদান, কারণ এটিই সবচেয়ে স্থায়ী”
একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান কখনো তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে, আবার কখনো তা বড় চ্যালেঞ্জের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও কার্যকর কূটনীতি থাকলে যেকোনো দেশই তার ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে। তাই তো বিশিষ্টজনেরা বলে থাকেন, “ভূরাজনীতি শুধু মানচিত্রের খেলা নয়; এটি ভৌগোলিক অবস্থানকে শক্তি, সম্ভাবনা ও প্রভাবের উৎসে পরিণত করার কৌশল।”
উদাহরণ হিসেবে আমরা তিনটা দেশকে সামনে রাখতে পারি।
এক্ষেত্রে প্রথম দৃষ্টান্ত হলো সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশের তুলনায় মাত্র ছয় বছর আগে স্বাধীনতা অর্জন করা এই ছোট্ট রাষ্ট্রটি তার কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আজ বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির দেশে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রবন্দর, বিনিয়োগ ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে তারা এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। আবার ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর ও এশিয়া-ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে ভারত ও মিয়ানমার, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার এক প্রাকৃতিক সেতু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা যায়।
২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিজয় এবং ২০১৪ সালে সালিশি আদালতের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সমুদ্রে তার সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এ অর্জন দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সমুদ্রসীমায় অধিকার প্রতিষ্ঠার পর সেই বিশাল জলরাশির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর তেমন কোন আগ্রহ তৎকালীন সরকারের ছিলনা। সমুদ্র বিজয় নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক অর্জন; কিন্তু সেই অর্জনকে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। যেখানে পাশ্ববর্তী ভারত ও মায়ানমার বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলন করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাহিরে রপ্তানি করছে, সেখানে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে আমাদেরকে বহিঃবিশ্ব থেকে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাংলাদেশের গুরুত্ব কেবল সামুদ্রিক সম্পদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও জাপানের মতো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতি যেমন আমাদের জন্য বড় সম্ভাবনা, তেমনি একে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামলানোর প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য।
এ ক্ষেত্রে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। বন্দরটি কার্যকরভাবে গড়ে তোলা ও পরিচালনা করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পণ্য পরিবহনের ব্যয় হ্রাস, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হবে। তবে কেবল বন্দর নির্মাণ করলেই চলবে না; এর সঙ্গে আধুনিক সড়ক ও রেল যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চল, দক্ষ জনশক্তি এবং কার্যকর লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
উদীয়মান বিশ্বশক্তি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের নানা উদ্যোগ রয়েছে। বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের নিয়েও চীনে আগ্রহ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সরাসরি অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা বাংলাদেশের জন্য বিরাট সুযোগ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে চীনের প্রভাবকে কমাতে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে জাপান ‘বিগ-বি’ (Bay of Bengal Industrial Growth Belt) উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ প্রকাশ করেছে । এর লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। তবে এসব উদ্যোগের ক্ষেত্রে অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্যতা, বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেই বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এখান থেকেই তৈরি হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা। চীন ও জাপানের বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের নিরাপত্তা, আর্থিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ, স্বাধীন ও বাস্তবমুখী। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। তবে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি মানে সবার সঙ্গে হুবহু একরকম সম্পর্ক রাখা নয়; বরং প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ ও সক্ষমতাকে নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার কোনো কমতি নেই। প্রয়োজন শুধু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর বাস্তবায়ন। ভূরাজনীতি আমাদের সুযোগ এনে দিতে পারে, কিন্তু তাকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে পরিপক্ব ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হলে বাংলাদেশ অচিরেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রকৃত অর্থনৈতিক সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ন অবস্থান নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে ইনশাআল্লাহ।
মাওলানা মুহাম্মদ বোরহান উদ্দীন
তরুণ আলেম, ময়মনসিংহ
বার্তা প্রেরণে :
এম.এ.এইচ রাকিবুল ইসলাম
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

























