এক বছর পরও মাইলস্টোনের আকাশে ফিরে আসে সেই ভয়াল স্মৃতি
স্কুলের ঘণ্টা বাজে। শিক্ষার্থীরা আবারও মাঠে খেলাধুলা করে, ক্লাস শেষে স্বাভাবিক নিয়মে বাড়ি ফেরে। রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এখন আগের মতোই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। তবে এক বছর আগে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবককে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল শিক্ষার্থী। ওই দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই দিনের আতঙ্ক ও মানসিক ক্ষত।
সম্প্রতি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করছে, কেউ কেউ মাঠে খেলছে। শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হলেও আকাশে বিমান উড়ে যাওয়ার শব্দ অনেকের মনে ফিরিয়ে আনে সেই ভয়াবহ বিকেলের স্মৃতি।
এক ঘণ্টার অপেক্ষার পর মিলেছিল বোনের খোঁজ
দুর্ঘটনার দিন ছোট বোনকে খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলয় আল নাফিকে। তার ছোট বোন তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত এবং অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য দুর্ঘটনাকবলিত ভবনে অবস্থান করছিল।
নাফি জানায়, ঘটনার সময় সে ও তার মা স্কুলের বাইরে ছিলেন। হঠাৎ যুদ্ধবিমানের মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। কিছুক্ষণ পর বিস্ফোরণের শব্দে ঘুরে দেখেন, ভবনের একটি অংশে আগুন জ্বলছে। বোন ভেতরে থাকায় তারা দ্রুত স্কুলের দিকে ছুটে যান।
উদ্ধারের সেই মুহূর্ত স্মরণ করে নাফি জানায়, ভবনের জানালা কেটে এবং বিভিন্নভাবে অনেক শিক্ষার্থীকে বের করে আনা হচ্ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তার বোনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় এক ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা ১০ মিনিট পর স্কুলের গেটের কাছে বোনকে খুঁজে পান তারা।
দুর্ঘটনার পর তার বোন দীর্ঘদিন মানসিক আঘাতের মধ্যে ছিল বলেও জানায় নাফি। প্রায় এক মাস সে ভয়ে থাকত এবং মাকে ছাড়া ঘুমাতে পারত না। তবে বর্তমানে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে।
শরীরের ক্ষত শুকালেও স্মৃতি ভুলতে পারেনি আলভীরা
দুর্ঘটনার সময় যে ভবনে বিমানটি আছড়ে পড়ে, সেখানেই ছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবাইদা নূর আলভীরা। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তাকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। বর্তমানে সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে।
আলভীরা জানায়, দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় সে মানসিক ট্রমার মধ্যে ছিল। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর দুর্ঘটনার স্মৃতি তাকে আরও বেশি কষ্ট দিত। বর্তমানে অনেকটাই স্বাভাবিক হলেও সেই দিনের কথা এখনও মনে পড়ে।
দুর্ঘটনার পর তাকে দুই মাস সাত দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল বলে জানায় আলভীরা। পরে স্কুল খুললে আবার নিয়মিত ক্লাসে ফিরেছে সে। এখন আর স্কুলে ভয় লাগে না, তবে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা এখনও মনে পড়ে।
আলভীরা জানায়, দুর্ঘটনায় হারানো বন্ধুদের মধ্যে আয়মানের কথা তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। তার সঙ্গে অনেক কথা হতো। এখন সেই বন্ধু আর নেই—এ স্মৃতি এখনও তাকে কষ্ট দেয়।
‘যে বন্ধুর হাত ধরে ছিলাম, তাকে আর খুঁজে পাইনি’
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া আরেক শিক্ষার্থী আশরিফা জান্নাত রাইসা বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। ঘটনার সময় সে দুর্ঘটনাকবলিত ভবনের নিচতলায় ছিল।
রাইসা জানায়, সে এক বান্ধবীর হাত ধরে সিঁড়ির কাছে হাঁটছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে বিমানটি আছড়ে পড়লে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। সে পড়ে যায়। পরে উঠে চারদিকে আগুন দেখতে পায়। তার সঙ্গে থাকা বান্ধবীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বাইরে বের হওয়ার পর কয়েকজনের মরদেহ দেখতে পেয়ে সে ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। প্রথম দিকে বিমানের শব্দ শুনলেই ভয় লাগত তার। তবে ধীরে ধীরে সেই ভয় কাটিয়ে উঠেছে রাইসা।
দুর্ঘটনায় তার দুই হাত পুড়ে যায়। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে নিয়মিত গ্লাভস ব্যবহার করতে হয়।
শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে কাউন্সেলিং
দুর্ঘটনার পর অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মাধ্যমের কো-অর্ডিনেটর আজমেরি বেগম জানান, দুর্ঘটনার পর ছোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। তাদের আবার স্কুলমুখী করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য সেকশনভিত্তিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রায় দুই মাস ধরে নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন পরিচালনা করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন ছিলেন শিক্ষার্থী। একই ঘটনায় যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও নিহত হন।
দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের স্মৃতি এখনও মুছে যায়নি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মন থেকে। শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক ছন্দে ফিরলেও আকাশে উড়ে যাওয়া কোনো বিমানের শব্দে অনেকের মনে আজও ফিরে আসে সেই ভয়াল দিনের স্মৃতি।


























