আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন আজ
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহু প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে আজ সোমবার (২৭ জুলাই)। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর সরকার-টু-গভর্নমেন্ট (জি-টু-জি) ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠতে যাওয়া এ শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্যসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পর্বে একটি সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষর হবে। পাশাপাশি সিইআইজেডের স্লোগান উন্মোচন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের উদ্বোধন, প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও সিইআইজেডকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ভবিষ্যতে এ অঞ্চলটি শিল্প ও লজিস্টিক কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সিইআইজেড বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এবং ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) সুবিধার আওতায় বৈদেশিক অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৪ দশমিক ২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, দৈনিক ৬০ টন সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বেজার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। ২০১৬ সালে প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও বিভিন্ন জটিলতায় দীর্ঘদিন প্রকল্পটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে ছিল।
শুরুতে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি) প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় কাজ এগোয়নি।
এদিকে, সিইআইজেডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকে কেন্দ্র করে আনোয়ারার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। উপজেলার বৈরব ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, ‘এই শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়িত হলে এলাকার মানুষ চাকরি পাবে। এতে বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হবে। আমরা চাই, প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। চাকরির ক্ষেত্রে যাতে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো, শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ লক্ষ্যে আনোয়ারা উপজেলায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল গড়ে উঠছে।’























