1. admin@kagojerbarta.com : admin :
  2. kamrul304076@gmail.com : Kamrul :
  3. jamalpurbakshiganj@gmail.com : Kamrulbk :
  4. seyam2858@gmail.com : seyam :
ঢাকা ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসামীর স্ত্রীর সাথে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার গোপনে সখ্যতা, উপহার নিয়েছেন আইফোন ও নগদ টাকা

সাভার প্রতিনিধি
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
২৬

সাভারের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী শামীম রেজা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তার মামলার গোপনীয়তা ভঙ্গ, অনৈতিক লেনদেন ও আসামির স্ত্রীর সাথে উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো: নেয়ামত উল্লাহর গভীর রাতের অনৈতিক যোগাযোগের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। শুধু তাই নয় দুটি আইফোন ও নগদ টাকা আদায়ের অভিযোগ ওই উপ-পরিদর্শকের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, শামীম রেজা গ্রেপ্তারের সময় তার কাছে থাকা নগদ ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা জব্দ তালিকায় না দেখিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে রিমান্ডে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন না করার শর্তে অভিযুক্ত উপ-পরিদর্শক মো: নেয়ামত উল্লাহসহ সাভার মডেল থানার এএসআই লিমনকে দুটি দামি ‘আইফোন-১৭ প্রো ম্যাক্স’ (যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে চার লক্ষ টাকা) উপহার দিতে বাধ্য করা হয়। শুধু তাই নয় জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন সময় আরও মোট ৩ লাখ টাকা আদায় করার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

ফাঁস হওয়া একাধিক কল রেকর্ড ও ভিডিও-অডিও বার্তা থেকে শোনা যায়, এসআই নেয়ামত উল্লাহ পেশাগত গোপনীয়তার তোয়াক্কা না করে পুলিশের নথিপত্র ও জব্দকৃত আলামতের সংবেদনশীল তথ্য আসামির স্ত্রীর কাছে পাচার করেছেন। এমনকি আসামীর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে জেলখানায় গিয়ে আসামির সাথে গোপনে দেখা করার সুযোগ তৈরীর বিষয়টিও ফোনালাপে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

এছাড়া নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষের অভিযোগ ঢাকতে ও নারীর সহানুভূতি পেতে ওই কর্মকর্তা ফোনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নাকাটি করেন। নিজেকে সৎ প্রমাণের দোহাই দিয়ে মসজিদের ভেতর বসে কুরআন ছুঁয়ে ভিডিও বানিয়ে পাঠিয়েছেন ওই নারীর কাছে। শুধু তাই নয় গভীর রাতে পবিত্র কুরআন সামনে রেখে অজু করে ভিডিও কলে আসার জন্য ওই নারীকে অযৌক্তিক ও অনৈতিক চাপ দেওয়ারও প্রমাণ মিলেছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত একাধিক কল রেকর্ড ও অডিও-ভিডিও বার্তায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো: নেয়ামত উল্লাহ ও শামীম রেজার স্ত্রী সুমাইয়া সাথীর ফোনালাপে শোনা যাচ্ছে -“মাহাবুবরে ধরতে পারলে থানায় একটার পর একটা জিডি করবেন। দুনিয়ার কেউ যেন না জানে, আমি তারে ধরে এনে দিতেছি… আপনাদের যেই থ্রেট দিক, প্রত্যেকটা জিডি করবেন।”

অপর একটি ফোনালাপে এসআই মো: নেয়ামত উল্লাহ শামীমকে দীর্ঘদিন কারাবরণ করতে অন্য কোন মামলায় না ফাঁসানোসহ বেশ কিছু তথ্য দেন শামীমের স্ত্রীর কাছে। এসময় মো: নেয়ামত উল্লাহকে বলতে শোনা যায়, “আমি তো স্যারদের সাথে সর্বোচ্চটা চেষ্টা করতেছি, তাকে যেন অন্য কোনো মামলায় না দেওয়া হয়। আর শামীমের সাথে এসপি স্যার, আলফা থ্রি ও আলফা সেভেন স্যারদের কথা হইছিল যে তোমারে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের করব।”

এদিকে গ্রেপ্তার শামীমের অটো গ্যারেজের চাবি উপ-পরিদর্শক মো: নেয়ামত উল্লাহর কাছে থাকলেও প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল চুরি হয়ে যায়। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা, সনাতন ধর্মী এক কিশোর নির্যাতন ও এসআই নেয়ামত উল্লাহর পরোক্ষ মদদে সেই লুটপাট ও চুরির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কৃত কথিত ছাত্রদল নেতা মাহাবুব হোসেন সামির ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে গ্যারেজ থেকে অটোরিকশা চুরি ও লুটপাটে যুক্ত থাকার বিস্তর তথ্য উঠে এসেছে। তবে থানায় একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করা হলেও মো: নেয়ামত উল্লাহ সেখানেও কথিত ছাত্রদল নেতার পক্ষে কাজ করেন বলে প্রশ্ন তুলেছিলেন শামীম রেজার স্ত্রী সুমাইয়া সাথী। পরবর্তীতে এখন পর্যন্ত মাহাবুব হোসেন সামিরসহ তার ৫ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে ৬ টি অটোরিকশা উদ্ধার করে ঢাকা জেলা পুলিশ। এর আগে নিজেকে বাঁচাতে সেই জন্য ফোনালাপে মো: নেয়ামত উল্লাহ মাদক ব্যবসায়ী শামীমের স্ত্রীকে কথিত ছাত্রদল নেতা মাহবুবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে বলেন, এছাড়াও তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে একান্ত ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে আরও বলেন “প্লিজ এই মামলাটা আদালতে করানোর ব্যবস্থা করেন। আমাদের স্যারদের নির্দেশ আপা। আমার যত সাপোর্ট দেওয়া লাগে, খালি কোনো রকম অর্ডারটা করায় আনেন ট্রিট ফর এফআইআর-এর।”

এদিকে মাহাবুবের কাছ থেকে ঘুষের অভিযোগ উঠলে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কান্নাকাটি করে মসজিদে বসে শামীমের স্ত্রীকে ভিডিও পাঠায় এসআই নেয়ামত উল্লাহ। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন “আল্লাহর এই কুরআনের কসম, আমি আপনাদের পরিবার এবং আপনার স্বামীর এই অটো নেওয়ার ব্যাপারে মাহাবুবরা কারা কারা নিছে, কীভাবে নিছে। আল্লাহর কসম আমি কিছুই জানি না। এক টাকাও যদি আমার পেটে যায়, আল্লাহর এই কুরআন যেন আমারে গজব দেয়।”

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত কল রেকর্ডে দেখা যায়, তদন্তের অজুহাতে এসআই নেয়ামত উল্লাহ বারবার আসামির স্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগত সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা চালান। এমনকি গভীর রাতে ফোন দিয়ে ভিডিও কলেও একান্তে দেখা করার তাগিদ দিতে শোনা যায় তাকে। ফোনালাপে ওই নারীকে এসআই বলেন, “আপনারে তো কালকেও ফোন দিলাম, আমার ফোন দেখলেন না, তো কিসের ডিপ্রেশন আমারে বলেন তো, এত কিসের ডিপ্রেশন? আপনি একটু কষ্ট করে আইসেন তো কাছে… একটু কষ্ট করে আইসেন। ফোনের লাইগাও আমি কথা কমু, অন্য ব্যাপারেও সামনা সামনি কিছু কথা কমু।”

অন্য এক রেকর্ডে এসআই পুনরায় তাকে একান্তে আসার চাপ দিয়ে বলেন “আমি আপনারে এতবার ফোন দিতাম না! আপনারে কতবার ফোন দিছি আমি, আমারে বলেন? আমি আপনারে এখন কিছু কথা বলব, সামনা সামনি কিছু কথা বলতে চাই।” এমনকি দেখা করার জন্য ওই নারীকে বার বার অনুরোধ করেন।

এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম বলেন “আমি মাত্র গতকালই এই থানায় নতুন যোগদান করেছি, তাই পূর্বের এসব ঘটনার বিষয়ে আমার জানা ছিল না। তবে স্পষ্ট করে বলতে চাই কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা অপরাধীর সঙ্গে কোনো ধরনের আপস বা ডিল করার সুযোগ নেই। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হলো। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্তপূর্বক তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীনকে একাধিক বার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে চাননি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নেয়ামত উল্লাহ প্রশ্ন এড়িয়ে যান। বিস্তারিত জানাবেন বলে সময় নিলেও পরবর্তীতে তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি।

এদিকে পুলিশের এ ধরনের ভূমিকা ও আইনগত দিক নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হরেকৃষ্ণ। তিনি জানান, পুলিশের পিআরবি আইন অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তা রাষ্ট্রপক্ষের কোনো মামলার গোপন তথ্য বা আলামত আসামি পক্ষকে প্রদান করতে পারেন না। তিনি কেবল বাদী পক্ষ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। গোপনে আসামির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা বা সুবিধা গ্রহণ করা পুলিশ প্রবিধান আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। যার জন্য অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রয়েছে।

উল্লেখ, সাভার মডেল থানার অভিযুক্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) নেয়ামত উল্লাহ কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণ পাড়া থানার গোপালনগরের আব্দুর রহিম ছেলে। তিনি এর আগে
চট্টগ্রাম জেলায় কর্মরত ছিলেন। তিনি চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি সাভার মডেল থানায় যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে তিনি দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান এর ব্যক্তিগত সহকারি হিসেবে কাজ করতেন এবং তার অনৈতিক লেনদেনের মূল ভূমিকা পালন করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া গত ২২ মে ২০২৬ তারিখ বিকেলে সাভার পৌর এলাকার পশ্চিম রাজাশন আইচানোয়াদ্দা এলাকায় মাদক সিন্ডিকেটের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক হামলার শিকার হন। পরবর্তীতে এই ঘটনায় সাভার মডেল থানায় মামলা দায়ের হলে আত্মগোপনে চলে যাওয়া মামলার প্রধান আসামি শামীম রেজাকে গত ১০ই জুন ২০২৬ তারিখে কক্সবাজার সদর থানার বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আলোচিত শামীম রেজার সঙ্গে তৎকালীন ওসি আরমান আলীসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার সখ্যতার অভিযোগ সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে আনেন অভিযুক্ত এসআই মো. নেয়ামত উল্লাহ নিজেই। সূত্র বলছে, তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই চলতি বছরের ২৪’মে এসআই মনিরুজ্জামান, এএসআই আসিফুর রহমান ও এএসআই মেরাজুল ইসলামকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে এর দুই দিন পর ২৬’মে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে তৎকালীন ওসি আরমান আলী এবং ১৫’জুন পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিনকেও প্রত্যাহার করা হয়। তবে পরবর্তীকালে সেই একই এসআই নেয়ামত উল্লাহর বিরুদ্ধেই মামলার তদন্তকে কেন্দ্র করে গোপনীয়তা ভঙ্গ, অনৈতিক যোগাযোগ, সুবিধা গ্রহণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ১১:০২:১৬ পূর্বাহ্ণ, রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

আসামীর স্ত্রীর সাথে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার গোপনে সখ্যতা, উপহার নিয়েছেন আইফোন ও নগদ টাকা

আপডেট সময় : ১১:০২:১৬ পূর্বাহ্ণ, রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
২৬

সাভারের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী শামীম রেজা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তার মামলার গোপনীয়তা ভঙ্গ, অনৈতিক লেনদেন ও আসামির স্ত্রীর সাথে উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো: নেয়ামত উল্লাহর গভীর রাতের অনৈতিক যোগাযোগের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। শুধু তাই নয় দুটি আইফোন ও নগদ টাকা আদায়ের অভিযোগ ওই উপ-পরিদর্শকের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, শামীম রেজা গ্রেপ্তারের সময় তার কাছে থাকা নগদ ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা জব্দ তালিকায় না দেখিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে রিমান্ডে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন না করার শর্তে অভিযুক্ত উপ-পরিদর্শক মো: নেয়ামত উল্লাহসহ সাভার মডেল থানার এএসআই লিমনকে দুটি দামি ‘আইফোন-১৭ প্রো ম্যাক্স’ (যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে চার লক্ষ টাকা) উপহার দিতে বাধ্য করা হয়। শুধু তাই নয় জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন সময় আরও মোট ৩ লাখ টাকা আদায় করার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

ফাঁস হওয়া একাধিক কল রেকর্ড ও ভিডিও-অডিও বার্তা থেকে শোনা যায়, এসআই নেয়ামত উল্লাহ পেশাগত গোপনীয়তার তোয়াক্কা না করে পুলিশের নথিপত্র ও জব্দকৃত আলামতের সংবেদনশীল তথ্য আসামির স্ত্রীর কাছে পাচার করেছেন। এমনকি আসামীর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে জেলখানায় গিয়ে আসামির সাথে গোপনে দেখা করার সুযোগ তৈরীর বিষয়টিও ফোনালাপে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

এছাড়া নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষের অভিযোগ ঢাকতে ও নারীর সহানুভূতি পেতে ওই কর্মকর্তা ফোনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নাকাটি করেন। নিজেকে সৎ প্রমাণের দোহাই দিয়ে মসজিদের ভেতর বসে কুরআন ছুঁয়ে ভিডিও বানিয়ে পাঠিয়েছেন ওই নারীর কাছে। শুধু তাই নয় গভীর রাতে পবিত্র কুরআন সামনে রেখে অজু করে ভিডিও কলে আসার জন্য ওই নারীকে অযৌক্তিক ও অনৈতিক চাপ দেওয়ারও প্রমাণ মিলেছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত একাধিক কল রেকর্ড ও অডিও-ভিডিও বার্তায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো: নেয়ামত উল্লাহ ও শামীম রেজার স্ত্রী সুমাইয়া সাথীর ফোনালাপে শোনা যাচ্ছে -“মাহাবুবরে ধরতে পারলে থানায় একটার পর একটা জিডি করবেন। দুনিয়ার কেউ যেন না জানে, আমি তারে ধরে এনে দিতেছি… আপনাদের যেই থ্রেট দিক, প্রত্যেকটা জিডি করবেন।”

অপর একটি ফোনালাপে এসআই মো: নেয়ামত উল্লাহ শামীমকে দীর্ঘদিন কারাবরণ করতে অন্য কোন মামলায় না ফাঁসানোসহ বেশ কিছু তথ্য দেন শামীমের স্ত্রীর কাছে। এসময় মো: নেয়ামত উল্লাহকে বলতে শোনা যায়, “আমি তো স্যারদের সাথে সর্বোচ্চটা চেষ্টা করতেছি, তাকে যেন অন্য কোনো মামলায় না দেওয়া হয়। আর শামীমের সাথে এসপি স্যার, আলফা থ্রি ও আলফা সেভেন স্যারদের কথা হইছিল যে তোমারে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের করব।”

এদিকে গ্রেপ্তার শামীমের অটো গ্যারেজের চাবি উপ-পরিদর্শক মো: নেয়ামত উল্লাহর কাছে থাকলেও প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল চুরি হয়ে যায়। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা, সনাতন ধর্মী এক কিশোর নির্যাতন ও এসআই নেয়ামত উল্লাহর পরোক্ষ মদদে সেই লুটপাট ও চুরির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কৃত কথিত ছাত্রদল নেতা মাহাবুব হোসেন সামির ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে গ্যারেজ থেকে অটোরিকশা চুরি ও লুটপাটে যুক্ত থাকার বিস্তর তথ্য উঠে এসেছে। তবে থানায় একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করা হলেও মো: নেয়ামত উল্লাহ সেখানেও কথিত ছাত্রদল নেতার পক্ষে কাজ করেন বলে প্রশ্ন তুলেছিলেন শামীম রেজার স্ত্রী সুমাইয়া সাথী। পরবর্তীতে এখন পর্যন্ত মাহাবুব হোসেন সামিরসহ তার ৫ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে ৬ টি অটোরিকশা উদ্ধার করে ঢাকা জেলা পুলিশ। এর আগে নিজেকে বাঁচাতে সেই জন্য ফোনালাপে মো: নেয়ামত উল্লাহ মাদক ব্যবসায়ী শামীমের স্ত্রীকে কথিত ছাত্রদল নেতা মাহবুবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে বলেন, এছাড়াও তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে একান্ত ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে আরও বলেন “প্লিজ এই মামলাটা আদালতে করানোর ব্যবস্থা করেন। আমাদের স্যারদের নির্দেশ আপা। আমার যত সাপোর্ট দেওয়া লাগে, খালি কোনো রকম অর্ডারটা করায় আনেন ট্রিট ফর এফআইআর-এর।”

এদিকে মাহাবুবের কাছ থেকে ঘুষের অভিযোগ উঠলে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কান্নাকাটি করে মসজিদে বসে শামীমের স্ত্রীকে ভিডিও পাঠায় এসআই নেয়ামত উল্লাহ। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন “আল্লাহর এই কুরআনের কসম, আমি আপনাদের পরিবার এবং আপনার স্বামীর এই অটো নেওয়ার ব্যাপারে মাহাবুবরা কারা কারা নিছে, কীভাবে নিছে। আল্লাহর কসম আমি কিছুই জানি না। এক টাকাও যদি আমার পেটে যায়, আল্লাহর এই কুরআন যেন আমারে গজব দেয়।”

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত কল রেকর্ডে দেখা যায়, তদন্তের অজুহাতে এসআই নেয়ামত উল্লাহ বারবার আসামির স্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগত সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা চালান। এমনকি গভীর রাতে ফোন দিয়ে ভিডিও কলেও একান্তে দেখা করার তাগিদ দিতে শোনা যায় তাকে। ফোনালাপে ওই নারীকে এসআই বলেন, “আপনারে তো কালকেও ফোন দিলাম, আমার ফোন দেখলেন না, তো কিসের ডিপ্রেশন আমারে বলেন তো, এত কিসের ডিপ্রেশন? আপনি একটু কষ্ট করে আইসেন তো কাছে… একটু কষ্ট করে আইসেন। ফোনের লাইগাও আমি কথা কমু, অন্য ব্যাপারেও সামনা সামনি কিছু কথা কমু।”

অন্য এক রেকর্ডে এসআই পুনরায় তাকে একান্তে আসার চাপ দিয়ে বলেন “আমি আপনারে এতবার ফোন দিতাম না! আপনারে কতবার ফোন দিছি আমি, আমারে বলেন? আমি আপনারে এখন কিছু কথা বলব, সামনা সামনি কিছু কথা বলতে চাই।” এমনকি দেখা করার জন্য ওই নারীকে বার বার অনুরোধ করেন।

এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম বলেন “আমি মাত্র গতকালই এই থানায় নতুন যোগদান করেছি, তাই পূর্বের এসব ঘটনার বিষয়ে আমার জানা ছিল না। তবে স্পষ্ট করে বলতে চাই কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা অপরাধীর সঙ্গে কোনো ধরনের আপস বা ডিল করার সুযোগ নেই। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হলো। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্তপূর্বক তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীনকে একাধিক বার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে চাননি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নেয়ামত উল্লাহ প্রশ্ন এড়িয়ে যান। বিস্তারিত জানাবেন বলে সময় নিলেও পরবর্তীতে তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি।

এদিকে পুলিশের এ ধরনের ভূমিকা ও আইনগত দিক নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হরেকৃষ্ণ। তিনি জানান, পুলিশের পিআরবি আইন অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তা রাষ্ট্রপক্ষের কোনো মামলার গোপন তথ্য বা আলামত আসামি পক্ষকে প্রদান করতে পারেন না। তিনি কেবল বাদী পক্ষ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। গোপনে আসামির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা বা সুবিধা গ্রহণ করা পুলিশ প্রবিধান আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। যার জন্য অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রয়েছে।

উল্লেখ, সাভার মডেল থানার অভিযুক্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) নেয়ামত উল্লাহ কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণ পাড়া থানার গোপালনগরের আব্দুর রহিম ছেলে। তিনি এর আগে
চট্টগ্রাম জেলায় কর্মরত ছিলেন। তিনি চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি সাভার মডেল থানায় যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে তিনি দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান এর ব্যক্তিগত সহকারি হিসেবে কাজ করতেন এবং তার অনৈতিক লেনদেনের মূল ভূমিকা পালন করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া গত ২২ মে ২০২৬ তারিখ বিকেলে সাভার পৌর এলাকার পশ্চিম রাজাশন আইচানোয়াদ্দা এলাকায় মাদক সিন্ডিকেটের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক হামলার শিকার হন। পরবর্তীতে এই ঘটনায় সাভার মডেল থানায় মামলা দায়ের হলে আত্মগোপনে চলে যাওয়া মামলার প্রধান আসামি শামীম রেজাকে গত ১০ই জুন ২০২৬ তারিখে কক্সবাজার সদর থানার বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আলোচিত শামীম রেজার সঙ্গে তৎকালীন ওসি আরমান আলীসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার সখ্যতার অভিযোগ সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে আনেন অভিযুক্ত এসআই মো. নেয়ামত উল্লাহ নিজেই। সূত্র বলছে, তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই চলতি বছরের ২৪’মে এসআই মনিরুজ্জামান, এএসআই আসিফুর রহমান ও এএসআই মেরাজুল ইসলামকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে এর দুই দিন পর ২৬’মে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে তৎকালীন ওসি আরমান আলী এবং ১৫’জুন পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিনকেও প্রত্যাহার করা হয়। তবে পরবর্তীকালে সেই একই এসআই নেয়ামত উল্লাহর বিরুদ্ধেই মামলার তদন্তকে কেন্দ্র করে গোপনীয়তা ভঙ্গ, অনৈতিক যোগাযোগ, সুবিধা গ্রহণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।