ভারতে ৫৯ বছরের পুরোনো মাদরাসার একাংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, তীব্র ক্ষোভ
ভারতের উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধার্থনগর জেলায় ৫৯ বছরের পুরোনো একটি মাদরাসার অর্ধেকের বেশি অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) জেলার পিপরা রামলাল গ্রামের আরাবিয়া জিয়া-উল-উলুম মাদরাসায় এ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
প্রশাসনের দাবি, মাদরাসাটির একটি অংশ সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশের পর প্রয়োজনীয় নোটিশ দিয়েই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা এ ঘটনাকে ‘অসাংবিধানিক’ এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা’ বলে অভিযোগ করেছেন।
ভেঙে দেওয়া হয়েছে সাত কক্ষ ও হলের অংশ
প্রায় ১৪ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে থাকা মাদরাসাটির সাতটি কক্ষ, একটি দোকান এবং হলের অর্ধেক অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে এ অভিযান চলে।
সকাল ৭টার দিকে ডোমরিয়াগঞ্জের এসডিএম বিবেকানন্দ মিশ্র, ডোমরিয়াগঞ্জের সিও ব্রিজেশ ভার্মা ও বানসি সিও শিবেন্দু সিংয়ের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পাঁচটি থানার প্রায় ১০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
যেভাবে শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে গ্রামের পাঁচ বাসিন্দা কথিত সরকারি জমি দখলমুক্ত করার দাবিতে ডোমরিয়াগঞ্জ তহসিলদারের আদালতে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পর ২০২৩ সালে মাদরাসার কথিত দখলকৃত অংশ উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে মাদরাসার তত্ত্বাবধায়ক আবদুল সালাম ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে একই বছর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করেন। প্রায় তিন বছর শুনানির পর গত ১৪ আগস্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত তহসিলদারের আদেশ বহাল রাখেন এবং মাদরাসার আবেদন খারিজ করে দেন।
এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কথিত দখল সরিয়ে নেওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দখল সরানো হয়নি—এমন দাবি করে মঙ্গলবার সকালে বুলডোজার অভিযান চালানো হয়।
মাদরাসা ভাঙার প্রতিবাদে বিক্ষোভ
অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে জড়ো হন সমাজবাদী পার্টির নেতাকর্মীরা। ডোমরিয়াগঞ্জের দলীয় বিধায়ক সৈয়দা খাতুন, জেলা সভাপতি লালজি যাদবসহ ৫০ জনের বেশি নেতাকর্মী সেখানে গিয়ে উচ্ছেদ বন্ধের দাবি জানান।
এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। পুলিশ তাদের বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে সামান্য ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
এসপি নেতা কামাল আহমেদ খান মাদরাসার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে বাধা দেয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়।
‘অসাংবিধানিক’ বলল আম আদমি পার্টি
মাদরাসা ভাঙার ঘটনায় উত্তরপ্রদেশের আম আদমি পার্টি (আপ) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলটির উত্তরপ্রদেশ শাখার বুদ্ধিস্ট প্রদেশের সভাপতি ইমরান লতিফ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
আপের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে কখন নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।
দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, এমন পদক্ষেপ ভারতের সংবিধানে নিশ্চিত করা সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষার অধিকারের ওপর আঘাত। তাদের দাবি, এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার বিষয় নয়; বরং আইনের শাসন ও সংবিধানের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।
‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা’
কংগ্রেস নেতা জাভেদ আশরাফ খান ঘটনাটিকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিজেপি ও আরএসএসের কাছে ধ্বংস করা ছাড়া অন্য কোনো সমাধান আছে কি না।
এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপও দাবি করেন তিনি।
রাজনৈতিক কর্মী আবদুর রকীব খান বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।’ মাদরাসা ভাঙার আগে সব সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, রাস্তা বা সরকারি জমি দখল করে থাকা সব সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রে সমান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
প্রায় ৪০০ শিশু পড়াশোনা করত
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থনগর জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ডোমরিয়াগঞ্জ তহসিলে অবস্থিত মাদরাসাটি ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৬৭ সালে এটি পিপরা রামলালের প্রধান সড়কের পাশে স্থানান্তর করা হয়।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, মাদরাসাটিতে প্রায় ৪০০ শিশু পড়াশোনা করত।
প্রশাসনের দাবি, মাদরাসাটি প্রথমে ব্যক্তিগত জমিতে নির্মাণ করা হলেও পরে এর সামনের খালি সরকারি জমিতে স্থাপনা সম্প্রসারণ করা হয়। ওই সম্প্রসারিত অংশকেই সরকারি জমি দখল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে মাদরাসা ভাঙার ঘটনায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকারি জমি উদ্ধারের নামে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করা উচিত নয়। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
সূত্র: মক্তব মিডিয়া


























